ভারত ও বাংলাদেশের মানুষকে আলাদা ভাবছি না

বেনাপোলে দীনেশ ত্রিবেদী

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

সড়ক পথে বাংলাদেশে পৌঁছে ভিসাসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন জটিলতার সমাধানে ‘পথ খোঁজার’ কথা বলেছেন ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।

ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, ব্যারাকপুরের সাবেক এমপি ও বিজেপি নেতা ত্রিবেদী গতকাল শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে স্ত্রী মৃণাল ত্রিবেদীকে সঙ্গে নিয়ে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। বাংলাদেশে ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাই কমিশনার পবন কুমার তুলসীদাস বাধে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি চিফ অব প্রটোকল আরিফ মাহমুদ সেখানে তাদের স্বাগত জানান।

ইমিগ্রেশন ও প্রটোকল সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সেরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন দীনেশ ত্রিবেদী। বেনাপোল ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে একজন সাংবাদিক দুই দেশের মধ্যে পর্যটন ভিসা আবার কবে চালু হবে জানতে চাইলে নতুন হাই কমিশনার বলেন, ‘আমি একটাই কথা বলতে পারি; আমাদের যা পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি, আর আমি কুঁড়ি কোটি অ্যাড করি, তাহলে ১৬০; ...তাহলে যা হবে, একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে আমি ভাবছি- আমার মনে ওইটা ঢুকছেই না।

‘দেখুন তো হেঁটে চলে এলাম, মনে হচ্ছে না যে আমি বাংলাদেশি না। ...সবসময় আমি বলি একই আকাশ একই বাতাস।’ ঢাকায় ভারতীয় মিশনের দায়িত্বে প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন দীনেশ ত্রিবেদী। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করে আসা ভার্মাকে বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ভারতের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালের অগাস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ শুরু হয় দুই তরফেই।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঢাকা ও দিল্লির দূরত্ব ঘোচানোর ‘কূটনীতিতে’ দীনেশ ত্রিবেদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবেন বলে মনে করছে দিল্লি। ভারত অবৈধ অভিবাসী আখ্যা দিয়ে মানুষজনকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে- এ বিষয়েও দীনেশ ত্রিবেদীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাংবাদিকরা।

জবাবে তিনি বলেন, ‘ডেমোক্রেসিতে অনেক ইশুজ থাকে। আপনার একটা বাংলাদেশের স্ট্রং ডেমোক্রেসি, আমাদেরও স্ট্রং ডেমোক্রেসি; দুই ডেমোক্রেসি মিলে গেলে একটা ওয়ার্ল্ড পাওয়ার হয়ে যায়, একটা পুরো ইকোনমিক ওয়ার্ল্ড পাওয়ার হয়ে যায়।

‘কিন্তু এই মেলামেশাটা দরকার, আর এর জন্য আমার যা দায়িত্ব আছে, আমি নিশ্চয়ই পালন করব। কিন্তু আপনার সাপোর্ট থাকা দরকার।’

গুজরাটি দম্পতি হীরালাল ত্রিবেদী এবং উর্মিলাবেন ত্রিবেদীর ছোট ছেলে দীনেশ ত্রিবেদী হিমাচল প্রদেশের বোর্ডিং স্কুল থেকে পড়াশোনার পর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে কমার্সে স্নাতক ডিগ্রি পান। তারপর টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করেন। দীনেশ ত্রিবেদী বাংলা বলতে পারেন এবং দুই বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও ভালো ধারণা রাখেন। সেতারবাদক হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে।

বেনাপোলে একজন সাংবাদিক ভারতকে বাংলাদেশের পাশের ‘বৃহৎ শক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করলে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘নো, নো আমাদের দুজনে মিলে শক্তি; একটা শক্তি হলে হবে না- দুজনে মিলে যা শক্তি হবে, ওইটাই আসল শক্তি। আর ওই শক্তিটা পুরো পৃথিবী যেন দেখে। ‘আমরা মিলেমিশে একটা ক্রিকেট টিম হলে কত ভালো হবে? খেলাধুলা, হেলথ তারপরে টেকনোলজি, এডুকেশন সব মিলে আমরা মিলে একটা টিম করে...।’

প্রবীণ রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদী দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। আশির দশকে ছিলেন কংগ্রেস নেতা। পরে ১৯৯০ সালে জনতা দলে চলে যান। ১৯৯০-৯৬ পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভায় জনতা দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে সেই দলে যোগ দেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনিই দলটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক। ২০০২-০৮ পর্যন্ত রাজ্যসভায় তৃণমূলের এমপি ছিলেন দীনেশ। ২০০৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে তৃণমূলের হয়ে লোকসভা ভোটে প্রার্থী হন। ওই আসনে জিতে কেন্দ্রের মনমোহন সিংহ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হন। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে সেই দায়িত্ব সামলান দীনেশ। পরে তাকে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের নির্বাচনে ব্যারাকপুর থেকে আবারও তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন দীনেশ, কিন্তু সেবার বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে হেরে যান। তারপর তৃণমূল তাকে আবার রাজ্যসভায় পাঠায়। কিছুদিন পর তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় দীনেশের। এর ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি তৃণমূল থেকে পদত্যাগ করেন এবং ৬ মার্চ বিজেপিতে যোগ দেন।