ইসলামী ব্যাংক
সচেতন গ্রাহক ফোরামের ৭ দফা আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানানোসহ ৭ দফা দাবি জানিয়েছে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম। গতকাল শনিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে ফোরামের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র অধ্যাপক নুর উন-নবী মানিক বলেছেন, না হলে রোববার থেকে নতুন কর্মসূচি দিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এদিন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত প্লাটফর্মটি।
সেখানে নুর উন-নবী মানিক বলেন, আমাদের দাবি সুস্পষ্ট, অবিলম্বে খুরশীদ আলমকে অপসারণ করে ব্যাংকিং ক্ষেত্রে দক্ষ, সৎ, পেশাদার ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে হবে। এস আলম ও ফ্যাসিস্টের দোসর কাউকে ইসলামী ব্যাংকে ঢুকতে দেওয়া হবে না, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না, ইসলামী ব্যাংক দখলের পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে। আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায়ী থাকতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
কদিন আগে জাতীয় সংসদে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে নুর উন-নবী মানিক বলেন, জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা। সেখানে উপস্থাপিত প্রতিটি তথ্য জনগণ সত্য ও নির্ভরযোগ্য বলে গ্রহণ করে। প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্যগত অসামঞ্জস্যপূর্ণতা শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের সুনাম নয়, সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, সত্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্বার্থে এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা হবে এবং প্রয়োজনে তথ্যগত সংশোধন করা হবে। গতকাল শনিবার বিকেল ৪টার মধ্যে আমাদের ৭ দফা দাবি না মানলে আজ রোববার ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। পাশাপাশি মঙ্গলবার (১৬ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হবে।”
৭ দফা দাবি:-১. অনতিবিলম্বে দুর্নীতিবাজ, ফ্যাসিবাদ ও ডাকাত এস আলমের দোসরকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে অপসারণ করে ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিকে বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করতে হবে। ২. যাদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো বন্দুকের মুখে দখল করেছিল তাদেরকে ফেরত দিতে হবে। কারণ ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন স্বাভাবিক উপায়ে ছিল না। ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগিতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপে জোরপূর্বক পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করিয়ে মালিকানা দখল করা হয়। সুতরাং যাদের কাছ থেকে ব্যাংক লুটেরা ও মাফিয়া দখল করেছিল তাদেরকে মালিকানা ফেরত দিতে হবে। প্রকৃত মালিকদের কাছেই এই ব্যাংক নিরাপদ। ৩. ব্যাংক লুটেরাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ বিভিন্ন ব্যাংক ফ্যাসিস্ট হাসিনা এবং তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় এস আলমসহ যারা লুট করেছে তাদের বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। এই ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তাদের দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে বাংলাদেশে এ রকম লুটেরা মাফিয়া গোষ্ঠীর আর জন্ম না হয়।
৪. ইসলামী ব্যাংকগুলোতে আতঙ্ক সৃষ্টি বন্ধ করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে স্থিতিশীলতা আনয়নের জন্য বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে বিরত থাকতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। ৫. লুটের অর্থ পুনরুদ্ধারে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত এনে ব্যাংকের দায় পরিশোধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে বিশেষ সেল গঠন করে লুটেরাদের সব স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রির মাধ্যমে ব্যাংকের দায় পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে লুটেরাদের বিচারের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত থেকে কোনো স্থিতাবস্থা যাতে লুটেরা জারি করতে না পারে, এ ব্যাপারে সরকারকে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ এই আদালত থেকে এস আলমের ঋণের কোনো অনিয়ম তদন্ত করা যাবে না মর্মে রুলনিশি জারি করা হয়েছিল। ৬. ব্যাংক লুটেরাদের ফেরার পথ রুদ্ধ করতে হবে।
ব্যাংক লুটেরাদের বিচার না করে তাদের পুনর্বাসন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে ব্যাংকিং রেজুলেশন আইন ১৮/ক ধারা সংযোজন করে। অবিলম্বে এ ধারা বাতিল করে লুটেরাদের ফেরার পথ রুদ্ধ করতে হবে। তারা যাতে ভিন্ন নামে আবার ব্যাংক দখল করতে না পারে এ জন্য লুটেরাদের সন্তান, স্ত্রী, সুবিধাভোগী এবং যে সব প্রক্সি কোম্পানীর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকে পরিচালক নিয়োগ করে অর্থ লুট করেছে তাদেরকে ব্যাংকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। ৭. জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘মিথ্যা বক্তব্য’ ও ডাকাত এস আলমের হাতে ব্যাংক তুলে দেওয়ার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
ঈদের ছুটির আগে শেষ কর্মদিবসে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার আগে সেদিন চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান পদত্যাগ করেন। খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন বছর মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হয়েছিলেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর খুরশীদ আলমসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা ইসলামী ব্যাংকে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের নানা ঘটনা ঘটে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ে সরকার গঠন করা বিএনপির সময়ে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে বেছে নেওয়া হয়।
ঈদের পরে ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে ‘গ্রাহক ফোরাম’ নামে ব্যানারে একদল লোক মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের কার্যালয়ের সামনে কয়েকদিন বিক্ষোভ করে। খুরশীদ আলমকে এস আলম গ্রুপের সহযোগী আখ্যা দিয়ে তাকে সরানোর দাবি তোলেন আন্দোলনকারীরা। তাদের কথা হল, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের দখলে যাওয়ার আগে যারা পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন তাদেরকেই ফেরাতে হবে। সে সময় বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ছুড়ে ও জলকামান দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ সতর্ক অবস্থান নেয়।
এরপর সংসদে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ নিয়ে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
