সুসংবাদ প্রতিদিন
খামারে মাছ, পাড়ে সবজি চাষ
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

বর্তমান সময়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে এক টুকরো সোনার হরিণ তথা সরকারি বা বেসরকারি চাকরির পেছনে ছুটে বেড়ানো যুবসমাজের এক চিরাচরিত দৃশ্য। প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ মাস্টার্স শেষ করে বেকারত্বের অভিশাপ ঘাড়ে নিয়ে ঘুরছেন। কিন্তু এই চেনা স্রোতের বিপরীতে হেঁটে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামের জাহিদুল ইসলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স পাস করার পর তিনি চাকরির পেছনে না ঘুরে নিজের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়েছেন মাটিতে, পানিতে। বাড়ির পাশে পতিত জমি ও পুকুরকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন এক অভিনব কৃষি ও মৎস্য খামার। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুধু তাকেই স্বাবলম্বী করেনি, বরং এলাকার অন্যান্য শিক্ষিত বেকার যুবকদের সামনে দেখিয়েছে এক নতুন আশার আলো। জাহিদুল ইসলামের এই সফলতার গল্পটা শুরু হয়েছিল বেশ হিসাব-নিকাশ করেই।
নিজের মেধা ও এলাকার মাটির উর্বরতাকে কাজে লাগানোর কথা ভাবেন তিনি। চান্দিনার মাধাইয়া ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামে নিজের ১২০ শতাংশ জায়গায় তিনি শুরু করেন মাছের রেণু চাষ। সাধারণত যেখানে মানুষ সনাতন পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে, সেখানে জাহিদুল বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক চিন্তাভাবনা থেকে রেণু চাষকে বেছে নেন। তার এই প্রজেক্টে তিনি রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বিভিন্ন জাতের মাছের রেণুর চাষ করছেন। জাহিদুল জানান, এই রেণুগুলো তিনি এক বছর ধরে পরম যত্নে লালন-পালন করেন। এরপর বড় হওয়া পোনা মাছের একটি অংশ তিনি বাজারে ভালো দামে বিক্রি করে দেন এবং বাকি অংশটুকু নিজের অন্য পুকুরগুলোতে চাষের জন্য রেখে দেন। মৎস্য চাষের এই চক্রাকার পদ্ধতি তার ব্যবসায়িক ঝুঁকি অনেক কমিয়ে এনেছে।
তবে জাহিদুলের দূরদর্শিতা শুধু মাছের রেণু চাষেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি তার মাছের প্রজেক্টের চারপাশের বিশাল পতিত পাড়কে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন। সাধারণত মৎস্য খামারের পাড়গুলো অবহেলায় পড়ে থাকে; কিন্তু জাহিদুলের চোখে তা ছিল এক বিরাট সম্ভাবনা। তিনি সেই পতিত পাড়ে চাষ শুরু করেন উচ্চ ফলনশীল হাজারী জাতের লাউসহ বিভিন্ন শীত ও গ্রীষ্মকালীন সবজির। প্রজেক্টের চতুর পাড়ে সবজি চাষের এই সমন্বিত উদ্যোগ তার খামারকে এক সুদৃশ্য সবুজ উদ্যানে পরিণত করেছে। মাছ চাষের পাশাপাশি সবজি চাষ করায় একই জমি থেকে দ্বিগুণ আয়ের পথ সুগম হয়েছে তার। যেকোনো ব্যবসায় পুঁজি এবং লাভের হিসাবটাই মূল চালিকাশক্তি। জাহিদুল ইসলামের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তিনি মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে মাছের রেণু চাষের এই প্রজেক্টটি শুরু করেছিলেন।
এরইমধ্যে তিনি মৎস্য প্রজেক্ট থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার রেণু ও পোনা মাছ বিক্রি করে দিয়েছেন। আর যে পরিমাণ মাছ তিনি নিজের পুকুরে চাষের জন্য মজুত রেখেছেন, তার বাজারমূল্যও বেশ চড়া। অন্যদিকে, প্রজেক্টের চারপাশের পতিত পাড়ে সবজি আবাদের জন্য তিনি বিনিয়োগ করেছিলেন মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। সবজির বাজার ওঠানামা করলেও ইতিমধ্যে তিনি সেখান থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করে ফেলেছেন। জাহিদুল আশাবাদী হয়ে জানান, বর্তমানে বাজারে সবজির দাম আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কিছুটা কম হলেও তার মাচায় এখনো প্রচুর পরিমাণ সবজি রয়েছে।
বাজারের দাম কিছুটা বাড়লেই তার লাভের পরিমাণ বহুগুণে বেড়ে যাবে। শিক্ষিত এই যুবকের এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগে শুরু থেকেই সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় কৃষি বিভাগ। বিশেষ করে মাধাইয়া ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানে আলম ভূঁইয়া জাহিদুলকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, সঠিক জাত নির্বাচন এবং বালাই ব্যবস্থাপনায় নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের এমন আন্তরিক সহযোগিতা জাহিদুলের মতো তরুণ উদ্যোক্তাদের পথ চলাকে অনেক সহজ ও মসৃণ করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার পর একজন তরুণ যখন মাঠপর্যায়ে কৃষি কাজে নেমে পড়েন, তখন তা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে বাধ্য। জাহিদুল ইসলাম সগর্বে জানান, এ দেশে পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো মানের চাকরি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ বিষয়। তাই চাকরিজীবী হওয়ার মোহে অন্ধ হয়ে নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট না করে তিনি নিজ উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে এই সমন্বিত চাষাবাদ শুরু করেছিলেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রথম দিকেই তিনি যথেষ্ট লাভের মুখ দেখেছেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন। জাহিদুলের এই গল্প প্রমাণ করে যে, সততা, মেধা আর সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে মাটিকেও সোনায় রূপান্তর করা সম্ভব। তিনি আজ চান্দিনা তথা পুরো কুমিল্লার বেকার যুবকদের জন্য এক অনুকরণীয় আত্মকর্মসংস্থানের প্রতীক।
