সুসংবাদ প্রতিদিন
মুরগির খামারে সচ্ছলতা
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মোয়াজ্জেম হোসেন, জয়পুরহাট

একসময় সংসারের আকাশে নেমে এসেছিল শোকের কালো মেঘ। বাবার মৃত্যুতে থমকে গিয়েছিল পরিবারের স্বপ্নের পথচলা। কিন্তু প্রতিকূলতার সেই অন্ধকারকে হার মানিয়ে নিজের শ্রম, মেধা আর অদম্য সাহসকে পুঁজি করে আজ তিনি হয়ে উঠেছেন সফল উদ্যোক্তার প্রতীক। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার মাতাপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা মিনহাজুল ইসলাম গড়ে তুলেছেন আধুনিক ‘মিনহাজুল পোল্ট্রি ফার্ম’। তার এই সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প এখন গ্রামবাংলার অসংখ্য তরুণের অনুপ্রেরণার উৎস।
২০০২ সালে এসএসসি পাসের পরই বাবাকে হারিয়ে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাধে। উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে পেছনে ফেলে মাত্র ১৪ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন ছোট্ট একটি পোল্ট্রি খামার। সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ পরিণত হয়েছে আধুনিক ও বহুমুখী প্রাণিসম্পদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে তার খামারে রয়েছে আধুনিক বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা, উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ২০১৭ সালে নির্মাণ করেন চারতলা আধুনিক পোল্ট্রি শেড, যা এলাকায় প্রথম দিকের বহুতল পোল্ট্রি খামার হিসেবে পরিচিত।
খামার ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটে কর্মীদের। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা আর প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম খামারটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা।
খামারের কর্মচারী রিমন হোসেন বলেন, আমি প্রায় ৮ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। মালিক আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো দেখেন। নিয়মিত বেতন, বোনাস ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাই। এই খামারের কারণে আমার পরিবার এখন স্বচ্ছল জীবনযাপন করছে। মিনহাজুল ইসলামের স্ত্রী সুমি আক্তার বলেন, বাবার মৃত্যুর পর আমরা খুবই বিপদে পড়েছিলাম। তখন অনেকেই ভেবেছিল আমাদের পরিবার হয়তো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু আমার স্বামী মিনহাজুল ইসলাম বাবু, নিজের পরিশ্রম আর সততার মাধ্যমে শুধু আমাদের পরিবার নয়, এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। ব্যবসার পরিধি বেড়ে মৎস্য, হ্যাচিং ও মেডিসিন ব্যবসা। স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুর রহমান খোকা বলেন, মিনহাজুল ইসলামের সাফল্য দেখে আমাদের এলাকার অনেক তরুণ খামার গড়ে তুলেছেন। তিনি নতুন উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দেন, সহযোগিতা করেন। তার কারণে এলাকায় বেকারত্ব কমেছে এবং অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে।
শুধু নিজের সাফল্যেই থেমে থাকেননি তিনি। তার অনুপ্রেরণায় ২০১৬ সালে চারজন বন্ধু মিলে প্রতিষ্ঠা করেন একটি হ্যাচারি। বর্তমানে তার কারিগরি সহায়তায় প্রায় ৮০ জনের বেশি খামারি তৈরি হয়েছে এবং বছরে প্রায় দুই লাখ সোনালি মুরগি উৎপাদনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখছেন তিনি।
উদ্যোক্তা মিনহাজুল ইসলাম বাবু বলেন, আমি ২০০২ সালে এসএসসি পাসের পর বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরেছি। সীমিত পুঁজি আর অদম্য সাহসকে সঙ্গী করে শুরু করি ছোট্ট একটি পোল্ট্রি খামার। বড় বোনের কাছ থেকে ১৪ হাজার টাকা ধার নেয়। এরপর সময়ের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা আর নিরলস পরিশ্রমে সেই খামার আজ পরিণত হয়েছে একটি সফল প্রাণিসম্পদ প্রতিষ্ঠানে। ব্যবসার পরিধি বেড়েছে মৎস্য, হ্যাচিং ও মেডিসিন ব্যবসা। বর্তমানে আমার এখন মাসিক আয় তিন লাখ টাকা।
তরুণ উদ্যেক্তা আবির হাসান বলেন, মাত্র ১৪ হাজার টাকার স্বপ্ন থেকে আজ শত মানুষের জীবিকার ঠিকানা, মিনহাজুল ইসলাম বাবু, যেন প্রমাণ করে চলেছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে গ্রাম থেকেই গড়ে উঠতে পারে সাফল্যের নতুন ইতিহাস। মিনহাজুল ইসলাম বাবু এখন মাৎপুর গ্রামের দৃষ্টান্ত। তার সাফল্যে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমিও চেষ্টা করব তার মতো সফল উদ্যোক্তা হতে।
আমার নিচের ভাগ্যে বদলায়নি। এখানে কর্সংস্থান সৃষ্টি হয়েছে অনেকের। এটা ভাবতেই খুউব ভালো লাগে। আক্কেলপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, মিনহাজুল ইসলাম বাবু, একজন আদর্শ ও সফল উদ্যোক্তা। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে তার ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। সেই সঙ্গে গ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস যারা খুঁজছেন, তাদের জন্য মিনহাজুল ইসলামের গল্প যেন এক জীবন্ত পাঠশালা। মাত্র ১৪ হাজার টাকার ছোট্ট উদ্যোগ আজ শতাধিক মানুষের জীবিকার উৎস, কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যে অসংখ্য তরুণের স্বাবলম্বিতার প্রেরণা এবং প্রাণিসম্পদ খাতের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই সংগ্রামকে সঙ্গী করে যে মানুষ স্বপ্নের পথে হাঁটতে জানে, সাফল্য একদিন তার দুয়ারে কড়া নাড়বেই। আক্কেলপুরের জামালগঞ্জের মাতাপুর গ্রামের মিনহাজুল ইসলাম সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
