বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর গতকাল সোমবার সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মুস্তাফা মনোয়ারের বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে মুস্তাফা মনোয়ারের সহকারী রুবেল মিয়া জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতাল থেকে তাদের ফোন করে মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ জুন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন মুস্তাফা মনোয়ার। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। কয়েক দিন আগে তার ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে নেওয়ায় আশার আলো দেখা দেয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় আবারও ভেন্টিলেটরে নেওয়া হয়। এর আগে তার স্ত্রী মেরী মনোয়ার জানিয়েছিলেন, ফুসফুসে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কারণে তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। দীর্ঘ কর্মজীবনে চিত্রকলা, শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণ, টেলিভিশন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অসামান্য অবদান রেখে তিনি দেশের অন্যতম শ্রদ্ধেয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
মুস্তাফা মনোয়ার জলরঙে ছবি আঁকতেন। কলকাতা আর্ট কলেজে পড়ার সময় ভীষণ প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, তার আঁকা ছবি খুব অল্পতে কথা বলতে পারে।
একসময় কলকাতার বিভিন্ন নাটকের দলের সঙ্গেও কাজ করেছেন মুস্তাফা মনোয়ার। ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর ছাত্র সন্তোষ রায়ের কাছে আলাদা করে গানও শিখতে শুরু করেছিলেন। সে সময় শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে তিন বছর গান করেছেন। পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের উদ্যোগে যে সাংস্কৃতিক দল গড়ে উঠেছিল, সেখানে যোগ দিয়ে বিভিন্ন স্থানে দেশাত্মবোধক গানও গেয়েছেন। অনেক চর্চা করতে হয় বলে গানটা ছেড়ে দিলেন। বাঁধাধরা জিনিস তার ভালোও লাগতো না। বলতেন, ‘গানে তাল আছে, বড় ওস্তাদেরা টান দিয়ে তালে ফিরতে পারেন, আমি পারতাম না।’
তার ছেলেবেলায় রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সময়টা মুস্তাফা মনোয়ারের জীবনের অমূল্য স্মৃতি। সেই গল্পও একদিন বলেছেন। স্কুলে থাকতে বাবা কবি গোলাম মোস্তফার ক্যামেরা দিয়ে ফটোগ্রাফি করতেন। ১৯৫২ সালে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলে ক্লাস নাইনে পড়তেন। তখন ভাষা আন্দোলনের জন্য কার্টুন এঁকে এক মাসের জন্য জেলে গিয়েছিলেন। এসব ঘটনা তার মনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি করে। বাড়ি থেকে স্কুলে প্রথম হওয়ার চাপ ছিল না। বাবা শুধু বলতেন পড়তে, জানতে।
