সুসংবাদ প্রতিদিন

খানসামায় চীনাবাদাম চাষে বিপ্লব

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সিদ্দিক হোসেন, দিনাজপুর

দিনাজপুরের খানসামায় এখন কৃষকের নতুন স্বপ্ন চীনাবাদাম। সবুজ পাতার আড়ালে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা এই তৈলবীজের সোনালি ফসল যেন কৃষকদের জন্য হয়ে উঠেছে স্বস্তির নিঃশ্বাস। কম খরচে, সহজ পরিচর্যায় আর বাজারে ভালো দামের নিশ্চয়তায় দিন দিন বাড়ছে চীনাবাদাম চাষের আগ্রহ। ধান কিংবা অন্যান্য প্রচলিত ফসলের তুলনায় ঝুঁকি কম- এই বিশ্বাসই কৃষকদের টেনে নিচ্ছে এই তৈলবীজ ফসলের দিকে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে গ্রীস্মকালীন চীনাবাদামের আবাদ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। বিশেষ করে আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ছাতিয়ানগড় এলাকায় স্থাপিত বারি গ্রীষ্মকালীন চীনাবাদামণ্ড০৬ জাতের প্রদর্শনী প্লট যেন কৃষকদের জন্য এক জীবন্ত পাঠশালা। প্রতিদিনই কেউ না কেউ এসে দাঁড়ায় সেই মাঠের পাশে- পাতার রং দেখে, গাছের স্বাস্থ্য বোঝার চেষ্টা করে। অনেকেই মনে মনে ঠিক করে ফেলছে, আগামী মৌসুমে নিজের জমিতেও এই বাদামের চাষ করবে।এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের (প্রথম সংশোধিত) আওতায় খরিপ-১ মৌসুমে তৈলবীজ ফসল উৎপাদন বাড়াতে খানসামা উপজেলায় নিয়মিত প্রদর্শনী, পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের হাতে-কলমে শেখানো হচ্ছে আধুনিক ও লাভজনক চাষপদ্ধতি। কৃষকদের হিসাবও বলছে আশার কথা। এক বিঘা জমিতে গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকার ফসল বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। সার ও কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে অল্প বিনিয়োগেই মিলছে ভালো লাভ।

ছাতিয়ানগড় গ্রামের কৃষক আবু বক্কর সেই আশার কথাই জানালেন। তিনি ২০ শতক জমিতে বারি গ্রীষ্মকালীন চীনাবাদামণ্ড০৬ চাষ করেছেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চলায় তার জমিতে রোগবালাই কম, ফসলও ভালো। হাসিমুখে তিনি বলেন, লাভ ভালো হলে আগামী মৌসুমে আরও জমিতে বাদাম লাগাব। একই গ্রামের খাইরুল ইসলামও সন্তুষ্ট। সময়মতো পরিচর্যার কারণে তার ক্ষেত সবুজে ভরা। তার মতে, চীনাবাদাম এমন একটি ফসল যেখানে ঝুঁকি কম, আর বাজার ঠিক থাকলে কৃষকের জন্য এটি হতে পারে নির্ভরযোগ্য বিকল্প।এই চাষে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে নারীদের অংশগ্রহণে। ভেড়ভেড়ী ইউনিয়নের টংগুয়া গ্রামের কিষানি মনিজা বেগম জানান, বাদাম তোলা, শুকানো ও বাছাইয়ের কাজে নারীরা নিয়মিত কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে সংসারের আয় বাড়ছে, বাড়ছে আত্মবিশ্বাসও। তার আশা- চীনাবাদামের আবাদ বাড়লে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান আরও বিস্তৃত হবে।

চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় সাত হেক্টর জমিতে চীনাবাদাম আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগ মনে করছে, সঠিক পরিচর্যা ও ন্যায্য বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আগামী দিনে এ আবাদ আরও সম্প্রসারিত হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার বলেন, দেশের ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণে তৈলবীজ জাতীয় ফসল উৎপাদন বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। সেই লক্ষ্যেই উন্নত জাতের বারি গ্রীষ্মকালীন চীনাবাদামণ্ড০৬ মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কৃষকদের আয় বাড়াতে নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও অব্যাহত আছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, কম খরচ, সহজ উৎপাদন পদ্ধতি এবং বাজারে চাহিদার কারণে চীনাবাদাম কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সহায়তা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এই ফসলই হতে পারে এ অঞ্চলের অন্যতম লাভজনক।