সুসংবাদ প্রতিদিন
চান্দিনায় আউশ ধানে স্বপ্ন বুনছেন কৃষক
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

চলতি মৌসুমে চান্দিনার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠজুড়ে এখন শুধুই সবুজের সমারোহ। দিগন্তজোড়া মাঠে হালকা বাতাসে দুলছে কচি আউশ ধানের গাছ। মাঠের পর মাঠ সবুজ চাদরে ঢেকে থাকা এই দৃশ্য অবলোকন করলেই মন জুড়িয়ে যায়। কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এবার রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আউশ ধানের ব্যাপক আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং সঠিক সময়ে চারা রোপণ করতে পারায় ধান গাছের আকার-আকৃতি ও বৃদ্ধি হয়েছে চমৎকার। মাঠে মাঠে কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সবুজ পাতার এই সতেজতাই বলে দিচ্ছে, এবার আউশের বাম্পার ফলন হতে যাচ্ছে। যদি শেষ পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা না দেয়, তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করবে এই অঞ্চলের ধান উৎপাদন। উপজেলা কৃষি বিভাগের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি আউশ মৌসুমে চান্দিনার বিভিন্ন ব্লকে ও এলাকায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে মোট ৯ হাজার ৫৬ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ করা হয়েছে। যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বেশ সন্তোষজনক। বর্তমান সময়ে সরকার আউশ চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে নানা ধরনের প্রণোদনা, উন্নত মানের বীজ ও সার সরবরাহ করায় কৃষকদের মাঝে এই ধান চাষে আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। আউশ মূলত বৃষ্টি-নির্ভর ফসল হওয়ায় এতে সেচ খরচ তুলনামূলক অনেক কম লাগে। ফলে কম খরচে অধিক লাভের আশায় এবার চান্দিনার কৃষকেরা কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছিলেন। কৃষকদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম আর কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ের নিয়মিত তদারকি, দুইয়ে মিলে চান্দিনার ফসলি মাঠ এখন এক নয়নাভিরাম রূপ ধারণ করেছে। সরেজমিন চান্দিনার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা কেউ জমিতে আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ বা পোকা-মাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করছেন। মাঠে মাঠে এখন শুধু ধানের সবুজ পাতার ঢেউ। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর চারা রোপণের পর থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বড় রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। মাঝে মাঝে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাত ধানের গাছের বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ফলে প্রতিটি ধান গাছের স্বাস্থ্য ও অবয়ব অত্যন্ত চমৎকার ও পুষ্ট হয়ে উঠেছে। কৃষকদের চোখে-মুখে এখন শুধু এক বুক আশা আর আনন্দের ঝিলিক। তারা অত্যন্ত আশাবাদী যে, বিগত যেকোনো বছরের তুলনায় এবার বিঘাপ্রতি ধানের ফলন অনেক বেশি হবে।
তবে কৃষকদের এই আনন্দের মাঝেও এক অদৃশ্য শঙ্কা সবসময় কাজ করে, আর তা হলো প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা। আউশ ধান কাটার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত যদি কোনো ধরনের আকস্মিক বন্যা, শিলাবৃষ্টি বা কালবৈশাখী ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটে, তবে ঘরে ঘরে নবান্নের উৎসব আমেজ ছড়িয়ে পড়বে। কৃষকরা বলছেন, রক্ত জল করা ঘাম ঝরিয়ে তারা মাঠ সবুজ করেছেন। এখন শুধু সঠিক সময়ে ধান কেটে ঘরে তোলার অপেক্ষা। যদি আবহাওয়া আর কিছুদিন এমন শান্ত ও অনুকূলে থাকে, তবে তাদের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জিত হবে এবং কষ্টের সঠিক মূল্য তারা পাবেন। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানান, আউশ ধানের আবাদ সফল করতে তারা শুরু থেকেই কৃষকদের পাশে থেকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে আসছেন। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, সুষম সারের ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে পোকা দমনের বিভিন্ন কৌশল কৃষকদের শেখানো হয়েছে। মাঠপর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন, যাতে কোনো অবস্থাতেই ফসলের ক্ষতি না হয়। চান্দিনার ৯ হাজার ৫৬ হেক্টর জমির এই বিশাল সবুজ ক্যানভাস শুধু কৃষকের স্বপ্নই নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণেও বড় ভূমিকা রাখবে। এখন শুধু কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছাড়া সোনালি ধান কেটে গোলায় তোলার সোনালি প্রহর গোনার পালা।
