স্কুলছাত্রী হত্যা

দুই ফাঁসির আসামির সাজা কমে যাবজ্জীবন

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

শরীয়তপুরের জাজিরায় পঞ্চম শ্রেণির একছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দুই আসামিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন হাই কোর্ট। সেই সঙ্গে এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শেষে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী এবং বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাই কোর্ট বেঞ্চ সোমবার শুনানি এই রায় দেয়।

রায়ে নুরু মোড়ল ও চুন্নু মোড়লের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর অপরাধে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় স্বপ্না বেগম ও সেলিম চৌকিদারকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে, যাদের ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আশরাফুল আলম। আসামিপক্ষে আইনি লড়াইয়ে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ১৩ বছর বয়সী ওই কিশোরী জাজিরার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। মেয়েটি প্রায়ই প্রতিবেশী চুন্নু মোড়লের দ্বিতীয় স্ত্রী স্বপ্না বেগমের বাড়িতে যেত।

মামলার বাদী ও মেয়েটির বাবার অভিযোগ, স্বপ্নার বাড়িতে বিভিন্ন সময় ‘অনৈতিক’ কার্যকলাপ হত এবং নুরু মোড়লসহ অন্যরা সেখানে ইয়াবা সেবন ও জুয়ার আসর বসাত। তার মেয়ে এসব অনৈতিক কার্যকলাপ দেখে ফেলায় আসামিরা ক্ষিপ্ত ছিল এবং তাকে বিভিন্ন সময় ‘উসকানিমূলক’ কথা বলত।

২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার দিকে মেয়েটি হঠাৎ নিখোঁজ হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর বিকালে নাওডোবা মজিদ হাওলাদার কান্দি গ্রামের খোকন হাওলাদারের একটি পরিত্যক্ত ভিটা থেকে মেয়েটির গলায় গামছা বাঁধা ও পেট কাটা অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।

ওই ঘটনায় ১৪ সেপ্টেম্বর জাজিরা থানায় মামলা করেন ওই কিশোরীর বাবা।

মামলায় চুন্নু মোড়লের স্ত্রী স্বপ্না বেগম, নুরু মোড়ল, আল-আমিন, সুমন ওরফে টাইগার এবং জোসনা বেগমকে আসামি করা হয়।

আসামিরা ‘অজ্ঞাত আরও লোকজন’ নিয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়।

কিন্তু মামলার বিচারিক পর্যায়ে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নিহতের বাবা-মা ও স্বজনরা এজাহারে বর্ণিত অভিযোগের সমর্থনে সাক্ষ্য দেননি। বিশেষ করে মামলার এক নম্বর সাক্ষী হিসেবে বাদী ও কিশোরীর বাবা তার জবানবন্দিতে বলেন, তার মেয়ে ‘কিছুটা অনিয়ন্ত্রিত’ জীবনযাপন করত।

কে বা কারা তাকে কীভাবে হত্যা করেছে তা তিনি জানেন না। আসামিদের ব্যাপারে তার কোনো অভিযোগ নেই এবং উপস্থিত আসামিরা খালাস পেলে তার কোনো আপত্তি নেই। দুই নম্বর সাক্ষী নিহত কিশোরীর মাও জবানবন্দিতে একইরকম কথা বলেন।

আরো সাক্ষী দেওয়া তায়েম বেপারী এবং কিশোরীর মামাও জবানবন্দিতে ওই কিশোরীকে ‘উশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রণহীন’ আখ্যায়িত করেন।

তারাও বলেন, আসামিরা খালাস পেলে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে বাকি সাক্ষীরা আসামিদের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেন। কিন্তু তারা কেউই চাক্ষুস সাক্ষী ছিলেন না।

সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ২০১৯ সালের ৭ মে শরীয়তপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আব্দুস ছালাম খান রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে নুরু মোড়ল, চুন্নু মোড়ল, সেলিম চৌকিদার ও স্বপ্না বেগমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

পাশাপাশি তাদের প্রত্যেককে জরিমানা করা হয় ১ লাখ টাকা করে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আপিল হলে সেখানেও আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো চাক্ষুস সাক্ষী না থাকার বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়।

নিম্ন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ যেসব সাক্ষী হাজির করেছে, তাদের বয়ান ও চাক্ষুস সাক্ষী না থাকায় দুই আসামির সাজা কমিয়ে বাকি দুইজনকে খালাস দেওয়া হয়।