সুসংবাদ প্রতিদিন
দিনাজপুরে পাটের নতুন বীজে প্রতিবছর সাশ্রয় ১০০ কোটি টাকা
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
সিদ্দিক হোসেন, দিনাজপুর

পাট রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম স্থানে থাকলেও একটি বড় বাধা ছিল এর বীজ। প্রতিবছর ভারত থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার পাটের বীজ আমদানি করতে হতো। তবে এই পরনির্ভরশীলতা কাটাতে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)। সংস্থাটি উদ্ভাবিত ‘বিজেআরআই তোষা পাট-৯’ জাতের মাধ্যমে আগামী ৫ বছরের মধ্যে পাট বীজে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে এই জাতটি মাঠে কৃষকদের প্রদর্শনীতে দেওয়া হয়েছে। তাতে ভালো উৎপাদন পেয়েছেন কৃষকরা। পাটের ভালো আঁশের পাশাপাশি নিজ জমিতেই উৎপাদন করছেন ব্যবহারের জন্য পাটবীজ, যা আশা জাগিয়েছে কৃষকদের মাঝে। সেই সঙ্গে এবারে পাটের ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠেছেন এই জাতটির উৎপাদনে।
বিজ্ঞানীদের মতে, নতুন এই জাতটি স্বল্পমেয়াদি ও অধিক ফলনশীল। এই জাতের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো মাত্র ১০০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে ভালো মানের বীজ পাওয়া যায়। প্রতি হেক্টরে আঁশের ফলন প্রায় ৩.২৫ টন। গোড়া পচা রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ অনেক কম। জলাবদ্ধ মাটি বা পরিত্যক্ত জমিতেও এ পাট ভালো জন্মে। স্বল্প জীবনকাল হওয়ায় একই জমিতে বছরে ৩-৪টি ফসল ফলানো সম্ভব।
দিনাজপুরের নশিপুর এলাকার পাটবীজ উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্রে ১০ একর জমিতে এ জাতের প্রজনন বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। এই বীজ দেওয়া হবে বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন-বিএডিসিকে। বিএডিসি এই পাটবীজ তাদের জমিতে আবাদ করে আরও বেশি উৎপাদন করবে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেবে। এ ছাড়া জেলার ৪৫ জন কৃষককে এই বীজের প্রদর্শনী প্লট দেওয়া হয়েছে।
চিরিরবন্দরের কৃষক সেকেন্দার আলী জানান, নতুন জাতটি লম্বা ও সতেজ হওয়ায় আঁশ যেমন ভালো পাওয়া যায়, তেমনি বীজ রেখে পরের বছরের জন্য নিশ্চিন্ত থাকা যায়। পাট পচানোর জায়গার অভাব থাকলেও ভালো দাম পাওয়ায় তারা এখন কৃত্রিমভাবে জলাশয় তৈরি করে পাট পচাতেও আগ্রহী। পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. নার্গীস আক্তার জানান, দেশে বছরে পাটবীজের চাহিদা ৫,৫০০ থেকে ৬,০০০ টন। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রজনন বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই প্রজনন বীজ বিএডিসির মাধ্যমে সারাদেশের কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানান, পাটকে আবারও সোনালি আঁশের গৌরবে ফেরাতে ২৫ বছর মেয়াদি দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য একটাই- বিদেশি বীজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের লাভবান করা এবং পরিবেশবান্ধব পাটের উৎপাদন বাড়ানো।
চিরিরবন্দরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুভাশীষ অধিকারী বলেন, এবারে পাটের দাম ভালো। এ জন্য কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। তোষা পাট-৯ জাতটি ভালো, সহজলভ্যভাবে এই বীজ পাচ্ছেন কৃষকরা। এই জাতে নিড়ানি কম লাগে এবং পতিত জমিতেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। পাট ভালো এবং বীজ যেসব কৃষক করছেন তারাও ভালো দাম পাচ্ছেন। কৃষকরা ভালো দাম পেলে কৃত্রিমভাবেই জলাশয় তৈরি করে পাট পচানোর ব্যবস্থা করবেন।
দিনাজপুর পাটবীজ উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্রের জেএফএ মোজাম্মেল হক বলেন, দিনাজপুর অঞ্চলে পাটচাষিদের বীজের ঘাটতি রয়েছে। তোষা পাট ১০০ দিনের জীবনকাল এবং ফলন ভালো। এই ঘাটতির সমাধান করতে আমরা ৪৫ কৃষকের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করেছি। তারা নিজেরাই বীজ উৎপাদন করছেন। এতে তাদের চাহিদা পূরণ হবে এবং বিক্রি করে অন্য কৃষকদেরও বীজের ঘাটতি পূরণ করবে।
দিনাজপুর পাটবীজ উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোস্তানছির বিল্লাহ বলেন, পাট চাষের জন্য নতুন তোষা পাট-৯ জাতটি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ফলাফলে সন্তুষ্ট এবং মাঠ পর্যায়ে দেওয়ার উপযোগী। আমরা কৃষকদের প্রদর্শনী দিয়েছি। ফলাফল অনেক ভালো। পাটের উপযুক্ত দাম থাকলে এবং পচানোর সময় কমানো গেলে পাট চাষে কৃষকরা আগ্রহী হবেন। এতে এবারে প্রচুর পাট উৎপাদন হবে। পাট পচানোর জন্য জলাশয়ের অভাব রয়েছে। এ জন্য নতুন প্রযুক্তিও উদ্ভাবন করা হচ্ছে। মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ করতে কাজ করা হচ্ছে।
