সড়কের শৃঙ্খলায় এআই সাফল্য

* ২০ প্রতিবন্ধকতায় শঙ্কা * ট্রাফিকে এআই : ৩০০ কোটিতেও হয়নি, * আশা দেখাচ্ছে ১৮ কোটি টাকার প্রকল্প

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বিদেশি প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পর, দেশীয় প্রযুক্তিতে শৃঙ্খলায় ফিরছে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা। যানবাহন ও চালকদের নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক সিগন্যালে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। তবে অল্পবৃষ্টিতেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এই প্রযুক্তি। আছে আরও ২০টিরও বেশি প্রতিবন্ধকতা। তাহলে কীভাবে আলোর মুখ দেখবে এই পাইলট প্রকল্প? নাকি আগের প্রকল্পগুলোর মতোই হারিয়ে যাবে এটি-ও? ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে গেল আড়াই দশকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ৫টির বেশি বিদেশি প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। তবে এবার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সফলতা এসেছে। এক ট্রাফিক পুলিশসদস্য জানান, এখন প্রায় ৯০ ভাগ অটো ট্রাফিক সিগনালে থেমে যায়। এছাড়া রাস্তায় চলাচল করা সাধারণ মানুষ বলছেন, আগে কেউ ট্রাফিক আইন না মানলেও এখন বেশিরভাগই ট্রাফিক আইন মেনে চলে। এছাড়া এআই ক্যামেরা থাকায় মানুষ এখন সিগনাল মানছেন বলেও জানান অনেকে।

কাগজ-কলম আর অনিয়ম আর পেছনে ফেলে গেল কয়েক মাসে দেশিয় প্রযুক্তির ব্যবহারে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে এনেছে অভাবনীয় সাফল্য। প্রশ্ন হলো কীভাবে কাজ করছে নিজ প্রযুক্তি? আর কীভাবেই বা আইনের আওতায় আসছে ট্রাফিক অপরাধ? রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা আনতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে গেল বছর নগরের ২২টি পয়েন্টে বসানো ডিজিটাল লাইটিং ব্যবস্থায় বর্তমান সরকারের উদ্যোগে ঢাকা মহানগর পুলিশ যুক্ত করছে সিসিটিভি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ইন্টেলিজেন্ট সার্ভার। আর ডিএমপির নিজেস্ব ওয়েব সার্ভারের মাধ্যমেই নথিভুক্ত হচ্ছে ট্রাফিক অপরাধ।

সড়কে কৃত্রিমভাবে একটি অদৃশ্য রেখা তৈরি আছে। সিগন্যালে লালবাতিতে কোনো গাড়ি এটি পার হলেই সার্ভার অপরাধ চিহ্নিত করে। আবার সবুজ বাতিতে এখানে থামলেও শনাক্ত হয় অপরাধ। স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণ করে ২৫ সেকেন্ডের ভিডিও ফুটেজ, যা ব্যবহার করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেয় ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ। একই প্রযুক্তি কাজ করছে সাইড লাইন ও জেব্রা ক্রসিংয়েও। এছাড়া বাম লেন বন্ধ উল্টো দিকে আসা, সিগনাল ভাঙাসহ বেশ কয়েকটি প্রতিবন্ধকতা শনাক্ত করছে এই প্রযুক্তি। এতেই চালক ও যানবাহন আওতাভুক্ত হচ্ছে ট্রাফিক মামলার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব পক্ষের দীর্ঘদিনের সমন্বয় হীনতা দূর, সফলতার পথ দেখিয়েছে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘সমন্বয়ের যে একটা ঘাটতি ছিলো, আমি বলব, এই ঘাটতিটা আমরা অতিক্রম করতে পেরেছি। কারণ এখানে আমরা সিগনাল ডিজাইন করছি। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করছি। আমরা প্রযুক্তিটা বসাচ্ছি। সিটি কর্পোরেশন প্রযুক্তি বসানোর আগে যে কাজগুলো করার, তারা সেগুলো করছে। একইসঙ্গে পুলিশ এটা সানন্দে গ্রহণ করেছে।’

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘ঢাকা মহানগরবাসী আমাদের চালু করা সিস্টেমের প্রতি সমর্থন দেখিয়েছে। এজন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’ সাফল্য আসলেও এই প্রযুক্তিতে আছে নানা প্রতিবন্ধকতা। প্রযুক্তির আওতাভুক্ত নেই পথচারী ও অটোরিকশা। এতে অর্জিত সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়া হালকা বৃষ্টি, ইন্টারনেট জটিলতা, ইদুরের উৎপাতেও বন্ধ হয়ে যায় এই সিগন্যাল ব্যবস্থা।

আছে প্রযুক্তিগত তথ্যের ঘাটতিসহ অন্তত ২০ ধরনের প্রতিবন্ধকতা। যদিও ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বলছে, পাইলট এই প্রকল্প মনিটরিং করে নির্ভুল ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আগামী ৬ মাসেই বড় প্রজেক্ট তৈরি করা হবে। পুলিশ কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, ‘আগামী ছয় মাসের মধ্যে আমরা আশা করছি, আমাদের প্রায় ৬০ এর বেশি সেমি অটোমেটিক সিগনাল লাগানো হবে। আর এটা যদি হয়, তাহলে আমরা প্রতিটি জাংশনে গড়ে ৫টি করে ক্যামেরা চিন্তা করছি।’ আড়াই দশকে ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নে অন্তত ৭টি বড় প্রকল্প নেয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, জাইকা এবং সরকারি অর্থায়নে এসব প্রকল্পে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও অব্যবস্থাপনার কারণে অধিকাংশই অকার্যকর হয়ে পড়ে। সর্বশেষ, বুয়েট ও ট্রাফিক বিভাগের ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এই পাইলট প্রকল্প আশার আলো দেখাচ্ছে। দেশের রাজধানী ঢাকায় ৩০টি মোড়ে বা ক্রসিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্যামেরা বসিয়ে যান চলাচলে শৃঙ্খলা আনার সুফল পাওয়া গেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ঢাকার মতো চট্টগ্রামেও সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলীরা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু সাদাত মোহাম্মদ তৈয়ব বলেন, স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে। এক মাসের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হবে। এরপর অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, নগর পুলিশ, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম নগরের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে।

৫৩ স্থানে প্রয়োজন স্মার্ট সিগন্যাল

সিটি কর্পোরেশনের সম্ভাব্য প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরে ১৯৬টি ইন্টারসেকশন বা মোড় এবং ৩২টি ইউটার্ন রয়েছে। এর মধ্যে ৫৩টি স্থানে স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যালের মাধ্যমে নজরদারি ও সহায়তা প্রয়োজন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থান কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টার থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। সিটি কর্পোরেশনের পরিকল্পনায় শুধু সংকেত বাতি বসানো নয়; সড়কের নেটওয়ার্ক, মোড়ের ধরন, যানজটপ্রবণ এলাকা, নজরদারি ক্যামেরা বসানোর জায়গা, সংকেত বাতি স্থাপনের জন্য উপযুক্ত মোড় এবং সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রাথমিক হিসাব তৈরির কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলমান রয়েছে বলেও এক নথিতে উল্লেখ আছে।

সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, স্মার্ট সিগন্যাল প্রকল্পের জন্য চট্টগ্রাম নগরের কিছু মোড়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে জিইসি, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, ওয়াসা, লালখান বাজার, টাইগারপাস, স্টেশন রোড, কদমতলী, অক্সিজেন, এ কে খান, ফৌজদারহাট, সিটি গেট, আগ্রাবাদ, বাদামতলী, বারিক বিল্ডিং, নিউমার্কেট, কাস্টম হাউস, সিইপিজেড গেট, হালিশহর বাজার, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, কালুরঘাট, চকবাজার, আন্দরকিল্লা, জামালখান, সিআরবি, ডিসি হিল ও কাজীর দেউড়ি।

সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলীরা জানান, বর্তমানে নগরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ মূলত ম্যানুয়াল (প্রথাগত পদ্ধতি)। অর্থাৎ ট্রাফিক পুলিশ চোখে দেখে সিদ্ধান্ত নেন, কোন দিকের গাড়ি ছাড়বেন। প্রস্তাবিত স্মার্ট সিগন্যাল ব্যবস্থা গাড়ির চাপ, গতি, সারির দৈর্ঘ্য ও পথচারীর উপস্থিতি বুঝে সিগন্যালের সময় নিয়ন্ত্রণ করবে।

সিটি কর্পোরেশনের সম্ভাব্য প্রকল্পের জন্য তৈরি করা এক নথিতে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থায় ট্রাফিক ফ্লো ক্যামেরা, সিগন্যাল কন্ট্রোলার, পথচারী ডিটেক্টর, ইন্টারনেট ট্রাফিক ডেটা এবং ফ্লোটিং কার ডেটা ব্যবহার করা যাবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সংকেত সময় নির্ধারণ, পরিবর্তন ও মূল্যায়ন করা হবে। পিক আওয়ারে (অফিসে যাওয়া-আসার সময়) একধরনের ব্যবস্থা থাকবে। তখন যেদিকে গাড়ির চাপ বেশি, সেই দিকের সবুজ বাতির সময় বাড়ানো যাবে।

অফ-পিক আওয়ারে আরেক ধরনের ব্যবস্থা থাকবে। তখন অকারণে কোনো ফাঁকা সড়কে সবুজ বাতি জ্বলবে না। কোনো দিক থেকে গাড়ি এলে সংকেত সাড়া দেবে। পথচারী পারাপারের সময় শেষ হওয়ার আগে যদি দেখা যায় কেউ তখনও জেব্রা ক্রসিংয়ে আছেন, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পথচারী পারাপারের সময় বাড়ানো যাবে। কম যান চলাচলের মোড়ে সিগন্যাল ‘হোল্ড স্টেট’ ও ‘রেসপন্স স্টেট’- এই দুই অবস্থায় থাকবে। গাড়ি না এলে অপেক্ষায় থাকবে, গাড়ি এলে সাড়া দেবে। এ ব্যবস্থায় রাডার দিয়ে ২৫০ মিটার এবং ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে ৬০ মিটার পর্যন্ত গাড়ি শনাক্ত করার কথা বলা হয়েছে।