সুসংবাদ প্রতিদিন

চান্দিনায় হলুদ চাষে লাভবান কৃষক

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

বসতবাড়ির আশপাশে কত জায়গাই তো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। অনেকে সেসব জায়গাকে ঝোপঝাড় বা আবর্জনার ভাগাড় বানিয়ে রাখেন। কিন্তু একটু সদিচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে সেই অবহেলিত মাটিকেও যে সোনার খনিতে রূপান্তর করা সম্ভব, তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রামের রমিজ উদ্দিন। বাড়ির পাশে বছরের পর বছর পড়ে থাকা এক চিলতে পরিত্যক্ত জায়গায় হলুদ চাষ করে তিনি আজ শুধু নিজের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন না, বরং পুরো এলাকার মানুষের জন্য তৈরি করেছেন এক নতুন অনুপ্রেরণা।

চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রামের প্রত্যন্ত কোণে রমিজ উদ্দিনের বাড়ি। বাড়ির ঠিক পাশেই একখণ্ড নিচু ও ছায়াযুক্ত জমি অলস পড়ে থাকত। বর্ষায় সেখানে পানি জমতো, আর শুকনোর দিনে জন্মাতো আগাছা। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকা এই জমিটিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিলেন রমিজ উদ্দিন। একদিন হুট করেই মাথায় আসে মসলা জাতীয় ফসল চাষের চিন্তা। বিশেষ করে হলুদ চাষের জন্য খুব বেশি কড়া রোদের প্রয়োজন হয় না এবং সামান্য ছায়াযুক্ত স্থানেও এটি বেশ ভালো জন্মে। এই ধারণা থেকেই তিনি কোদাল হাতে নেমে পড়েন জমি তৈরিতে।

প্রাথমিকভাবে জমি থেকে আগাছা পরিষ্কার করে, মাটি কুপিয়ে ঝুরঝুরে করে নেন তিনি। এরপর নিজের জমানো সামান্য কিছু টাকা দিয়ে স্থানীয় বাজার থেকে উন্নত জাতের হলুদের বীজ সংগ্রহ করেন। কোনো ধরনের রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভর না করে, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে তৈরি গোবর সার এবং বাড়ির রান্নার সুতার ছাই ব্যবহার করে তিনি বীজ রোপণ করেন। রমিজ উদ্দিনের এই উদ্যোগে প্রথম দিকে অনেকেই অবজ্ঞার চোখে তাকিয়েছিলেন। অনেকে ভেবেছিলেন, পরিত্যক্ত অনাবাদি জমিতে হলুদ চাষ করে শুধু শুধুই শ্রম নষ্ট করছেন তিনি। কিন্তু সমস্ত নেতিবাচক মন্তব্যকে পেছনে ফেলে তিনি পরম যত্নে সকাল-সন্ধ্যা তার এই ছোট খেতের পরিচর্যা করে গেছেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রমিজ উদ্দিনের সেই পরিশ্রমের ফল দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। রোপণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মাটির বুক চিরে বের হতে শুরু করে সবুজ পাতা।

বর্তমানে তার খেতের হলুদের গাছগুলোর বৃদ্ধি এক কথায় সন্তোষজনক। গাঢ় সবুজ রঙের সতেজ পাতাগুলো বাতাসে দোল খেয়ে যেন তার অক্লান্ত পরিশ্রমের সার্থকতা জানান দিচ্ছে। গাছের চমৎকার এই বাড়বাড়ন্ত দেখে কৃষি সংশ্লিষ্টরা এবং প্রতিবেশীরাও এখন বেশ আশাবাদি।

রমিজ উদ্দিন নিজের ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানান, তিনি আশা করছেন এবার হলুদের অত্যন্ত ভালো ফলন হবে। বাজার থেকে চড়া দামে মসলা কেনার দিন হয়তো তার পরিবারটির জন্য ফুরিয়ে আসছে। নিজের পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত হলুদ তিনি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে পারবেন বলে দৃঢ় বিশ্বাস রাখছেন। তার এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে খরচ হয়েছে একেবারেই নামমাত্র; কিন্তু লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি।

মেহার গ্রামের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, চান্দিনার মাটি ও আবহাওয়া হলুদ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। রমিজ উদ্দিনের এই নীরব বিপ্লব দেখে এখন মেহার গ্রামসহ আশপাশের এলাকার অনেক মানুষই অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। গ্রামের অনেকেই এখন তাদের বাড়ির আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা অনাবাদি জমিতে এভাবে হলুদ বা অন্যান্য মসলা চাষের কথা ভাবছেন।

আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত ফসলি জমি কমে যাচ্ছে, অথচ বিশাল পরিমাণ বসতবাড়ির আশপাশের জায়গা অবহেলায় পড়ে থাকে। রমিজ উদ্দিনের মতো যদি দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষ তাদের অনাবাদি ও পরিত্যক্ত জমিকে এভাবে কাজে লাগাতে পারেন, তবে তা দেশের সামগ্রিক মসলা উৎপাদন বৃদ্ধিতে এক বিরাট ভূমিকা রাখবে।

চান্দিনার মেহার গ্রামের এই হলুদ খেতটি শুধু একটি ফসলের মাঠ নয়, এটি একটি বার্তা- সঠিক উদ্যোগ আর নিষ্ঠা থাকলে যেকোনো পরিত্যক্ত স্থানকেই উর্বর ও সম্ভাবনাময় করে তোলা সম্ভব। রমিজ উদ্দিনের এই সবুজ স্বপ্ন সফল হোক এবং তার দেখাদেখি আরও শত শত রমিজ উদ্দিন টেকসই কৃষির পথে এগিয়ে আসুক, এটাই এখন মেহার গ্রামবাসীর প্রত্যাশা।