হোয়াইট হাউসেও হামলা চালানোর সক্ষমতা আছে ইরানের

আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলোকিত ডেস্ক

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) একজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন সরাসরি হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হোয়াইট হাউসের ভেতরে ঢুকেও ট্রাম্পের ক্ষতি করার সক্ষমতা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রয়েছে। আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার হোসেইন কানানি মোকাদ্দেম ইরানের সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট ফারারুকে বলেন, ‘উদ্দেশ্য যদি ট্রাম্পকে হত্যা করা হয়, তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান হোয়াইট হাউসের ভেতরেই তা সহজে করতে পারে। যখনই প্রয়োজন হবে, আমরা তা করার সক্ষমতা রাখি।’ এ হুমকির পাশাপাশি মোকাদ্দেম তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার চলমান আলোচনা নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি জানান, ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ আলোচনার উদ্দেশ্য, কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো নয়। সাবেক এই কমান্ডার বলেন, ‘আমরা শান্তির জন্য শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি না। আমরা আলোচনা করছি উত্তেজনা কমানোর জন্য।’ তিনি আরও বলেন, মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে এ আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো, ইরানের দাবিগুলো জোরালো করা এবং ওয়াশিংটনের তোলা বিভিন্ন অভিযোগের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা।

হোসেইন কানানি বলেন, ‘আমরা ট্রাম্প ও তাঁর অপরাধী সহযোগীদের সঙ্গে শান্তির জন্য কোনো আলোচনা করছি না। এ আলোচনায় আমরা শুধু আমাদের অধিকার পুনরুদ্ধার এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর জবাব খুঁজছি। প্রতিশোধের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে পুরোপুরি বহাল রয়েছে (অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চললেও ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে ইরান সরে আসেনি)।’ মুজতাবা খামেনি ৯০ শতাংশ শেষ -দাবি ট্রাম্পের : ইরানজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় দেশটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং শীর্ষ কমান্ডাররা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনি ‘৯০ শতাংশ শেষ’ হয়ে গেছেন। গত সপ্তাহে তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজাতেও মুজতাবাকে অনুপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের কোনও নৌবাহিনী নেই, কোনও বিমানবাহিনী নেই, সব শেষ হয়ে গেছে। তাদের বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থাও ধ্বংস করা হয়েছে। তাদের সব সেরা নেতাকে হত্যা করা হয়েছে।’

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ‘এই যুদ্ধে ইরানের সেরা নেতারা প্রাণ হারিয়েছেন।’ ১৯৮৯ সালে মারা যাওয়া ইরানি বিপ্লবী নেতা ‘রুহুল্লা খোমেনি’র নাম ব্যবহার করে ট্রাম্প মূলত আলি খামেনিকেই ইঙ্গিত করে বলেন, ‘তারা শেষ। খামেনি শেষ।’

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এরপর ট্রাম্প বলেন, ‘তার ছেলেও ৯০ শতাংশ শেষ।’

বাবা আলি খামেনি নিহত হওয়ার ওই একই মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় মুজতাবা খামেনি আহত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। এরপর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। দীর্ঘদিন জনসমক্ষে না আসায় তার শারীরিক অবস্থা ও অবস্থান নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে নিয়ে ট্রাম্পের ওই মন্তব্য মুজতবার শারীরিক অবস্থা নিয় প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নতুন করে একে অপরের ওপর হামলা শুরু করার পর ট্রাম্প ইরানের মুজতাবা ৯০ শতাংশ শেষ বলে মন্তব্য করলেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট এরই মধ্যে কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে, গত সপ্তাহে ইরানের ওপর সামরিক পদক্ষেপ পুনরারম্ভের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি এবং একাধিক দফায় ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া ট্রাম্প ভিন্ন একটি প্রসঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বৈশ্বিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতাকে সমর্থন করার শত বছরের মার্কিন নীতি থেকে সরে এসে অন্য জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াতের জন্য এখন থেকে ফি বা মাশুল আদায় করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সম্পৃক্ত দুটি তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় এই হামলায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক নাবিক নিহত এবং আটজন আহত হন।

এই ঘটনার পর আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে, যা আবুধাবি ও দুবাইকে তেহরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। মূলত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এই লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হত।

হরমুজ প্রণালীতে দুই বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : হরমুজ প্রণালীতে চলাচলরত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি)। সোমবার রাতের এ হামলার তথ্য মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে নিশ্চিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা। তাদের দাবি, হামলায় দুটি জাহাজই উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। মার্কিন কর্মকর্তাদের একজন জানান, হামলার পর জাহাজ দুটি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় থাকলেও নাবিকরা নিরাপদে ছিলেন। ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এদিকে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য কার্যক্রম সংস্থা (ইউকেএমটিও) মঙ্গলবার ভোরে জানায়, ওমানের লিমা উপকূল থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পূর্বে দক্ষিণমুখী একটি ট্যাংকারের বাম পাশে অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাত লাগে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে এবং এতে কোনো হতাহত বা পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

হামলার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাতের পর কূটনৈতিক উদ্যোগ এগিয়ে নিতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। একই সঙ্গে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনা শেষ হলেও স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর ইরানের কঠোর অবস্থানের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার আবারও সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটন হয় তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে, নয়তো ‘কাজটি শেষ করে দেবে’।

অন্যদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার আগে সামুদ্রিক রেডিওর মাধ্যমে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জাহাজগুলোকে সতর্ক করে জানায়, ‘আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আপনাদের ওপর হামলা চালাতে প্রস্তুত।’ পত্রিকাটি একটি অডিও রেকর্ডিংয়ের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। হামলার শিকার হওয়া জাহাজগুলোর একটি হলো ‘আল রেকায়াত’, যা কাতারের এলএনজি খাতের শিপিং প্রতিষ্ঠান নাকিলাতের মালিকানাধীন ও পরিচালিত একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজটির বাম পাশে ইঞ্জিন রুমের ওপরের অংশে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত লাগে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রকাশিত আরেকটি রেকর্ডিংয়ে বলা হয়েছে, হামলার পর ইঞ্জিন রুমে আগুন ধরে যায় এবং ধোঁয়ায় পুরো অংশ ছেয়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা তখনই নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে জাহাজের সব নাবিক নিরাপদে ছিলেন এবং তারা জাহাজের ডান পাশে একত্রিত অবস্থায় ছিলেন।