সুসংবাদ প্রতিদিন
চান্দিনায় গ্রীষ্মকালীন লাউ চাষে লাভবান কৃষক
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সবজি চাষিরা এখন মাঠপর্যায়ে কোমর বেঁধে নেমেছেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন শুধু নানারকম সবজির আবাদ। এর মধ্যে বর্তমান মৌসুমে চান্দিনার কৃষকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে লাউ চাষকে ঘিরে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এবার লাউয়ের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা কৃষকদের মুখে ফুটিয়েছে এক চিলতে স্বস্তির হাসি।
উপজেলার মেহার গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, কৃষকদের এমন ব্যস্ততার চিত্র। এই গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেঁটে গেলেই দুই পাশে চোখে পড়ে সবুজ পাতার সমারোহ। মাচায় মাচায় ঝুলছে কচি লাউ, আবার কোথাও কোথাও শুধু ফুল ও কুঁড়ির আগমন ঘটছে। মেহার গ্রামের এমনই একজন উদ্যমী ও পরিশ্রমী কৃষক শাহজালাল। তিনি এবার তার ১২ শতাংশ জমিতে লাউ চাষ করেছেন। শাহজালালের লাউ খেতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি লাউ গাছ অত্যন্ত সতেজ এবং লকলকে হয়ে বেড়ে উঠছে। পুরো খেত যেন সাদা রঙের লাউ ফুলে ভরে আছে। ভ্রমরের আনাগোনা আর সতেজ পাতার সবুজ রঙে খেতটি এখন চোখ জুড়ানো এক রূপ ধারণ করেছে। কৃষক শাহজালাল জানান, তিনি অত্যন্ত যত্ন সহকারে সময়মতো সার ও সেচ দিয়ে খেতটি প্রস্তুত করেছেন। এখনও পর্যন্ত তার খেতের লাউ বাজারে বিক্রি শুরু হয়নি। তবে গাছের বর্তমান অবস্থা দেখে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি জানান, আর মাত্র অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি খেত থেকে পুরোদমে লাউ তোলা এবং বাজারে বিক্রি করা শুরু করতে পারবেন। বর্তমান বাজারের যে পরিস্থিতি, তাতে ভালো দাম পাবেন বলে তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। একই গ্রামের আরেকজন সফল চাষী আবুল কাশেম। তিনি আরও বড় পরিসরে লাউ চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন। এবার তিনি তার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গাতে লাউয়ের আবাদ করেছেন। আবুল কাশেমের খেতে গিয়ে দেখা যায়, মাঠজুড়ে তৈরি করা বাঁশের মাচায় লাউয়ের ডগাগুলো চমৎকারভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তার লাউ গাছে এখন সবেমাত্র ফুল আসতে শুরু করেছে। যদিও এখনও খেত থেকে কোনো লাউ বিক্রি শুরু হয়নি, তবে পুরো খেতের গাছের গ্রোথ বা বৃদ্ধি চমৎকার। সবুজ পাতার নিচে উঁকি দেওয়া কচি ফুলের কুঁড়িগুলোই বলে দিচ্ছে সামনের দিনগুলোতে কেমন ফলন হতে যাচ্ছে। নিজের খেতের পরিচর্যা করতে করতে আবুল কাশেম জানান, সবজি চাষে মূল বিষয় হলো সঠিক যত্ন এবং প্রকৃতির কৃপা। এখন পর্যন্ত আবহাওয়া পুরোপুরি তাদের অনুকূলেই রয়েছে। যদি আগামী দিনগুলোতেও আবহাওয়া এমন সতেজ ও ভালো থাকে, তবে গাছে এখন যে অবস্থা ও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, সে হিসাবে নিশ্চিতভাবেই অত্যন্ত চমৎকার ফলন আসবে। আর ফলন যদি আশানুরূপ হয়, তবে সব খরচ বাদ দিয়ে তিনি এবার বেশ ভালো অঙ্কের লাভ ঘরে তুলতে পারবেন।
চান্দিনার এই অঞ্চলে লাউ চাষের এমন ধুম পড়ার পেছনে বেশ কিছু বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্যান্য ফসলের তুলনায় লাউ চাষে যেমন খরচ কম, তেমনি এর ফলনও পাওয়া যায় খুব দ্রুত। সঠিক পদ্ধতিতে মাচা তৈরি করে বীজ রোপণ করলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গাছ বড় হতে শুরু করে এবং ফলন দেয়। তাছাড়া লাউয়ের রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় কীটনাশকের পেছনেও কৃষকদের বাড়তি টাকা গুনতে হয় না বললেই চলে। বর্তমানে বাজারে সবজির যে দাম, তাতে অন্যান্য ফসলের লোকসান পুষিয়ে নিতে লাউ চাষকেই সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন চান্দিনার কৃষকেরা।
মেহার গ্রামসহ চান্দিনার বিভিন্ন ব্লকে কৃষকদের এই লাউ চাষের প্রতি আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শ, সুষম সারের ব্যবহার এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কৃষকেরা এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা মাঠেই দিনরাত পরিশ্রম করছেন এই আশায় যে, তাদের উৎপাদিত সবজি যেমন দেশের পুষ্টির চাহিদা মেটাবে, তেমনি তাদের নিজেদের পরিবারেও এনে দেবে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। শাহজালাল কিংবা আবুল কাশেমের মতো উপজেলার শত শত চাষীর চোখে এখন শুধুই লাভের স্বপ্ন। মাঠে ফসলের এই চমৎকার অবস্থা যদি শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, তবে চান্দিনার লাউ চাষিদের এই হাসি আগামীতে আরও চওড়া হবে এবং এই অঞ্চলের সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে লাউ চাষ এক নতুন বিপ্লব ঘটাবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সচেতন মহলের।
