ভারতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম
* শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে মোদি সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম সিজেপির * মোদি সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসছে আন্দোলনকারীরা, বিক্ষোভও চলবে * আন্দোলনকারীদের শরীরে ছররা গুলির টুকরো, অস্বীকার পুলিশের * সরকার শিক্ষার্থীদের দেশের শত্রু হিসেবে গণ্য করছে : সোনিয়া গান্ধী * দেড় দশকে ভারতে যেসব গণবিক্ষোভ বদলে দিয়েছে রাজনীতির গতিপথ * ২৬ দিন পর অনশন ভাঙলেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আলোকিত ডেস্ক
পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের জেরে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের জন্য নরেন্দ্র মোদির সরকারকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে আন্দোলনকারী দল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। গতকাল শুক্রবার সরকারের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের সিজেপির পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ভিঠলভাই প্যাটেল হাউসে সিজেপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সরকার পক্ষে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এবং সিজেপির পক্ষে জাতীয় মুখপাত্র সৌরভ দাসসহ আরেক তরুণ প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। এটি ছিল উভয় পক্ষের মধ্যে তৃতীয় বৈঠক।
বৈঠক শেষে সিজিপির প্রতিনিধিরা জানান, সরকার নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হওয়া এফআইআর প্রত্যাহারে নীতিগত সম্মতি প্রকাশ করেছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি থেকে সরে আসবে না তারা।
সিজেপির প্রতিনিধি সৌরভ দাস বলেন, নিহতদের পরিবারকে ১ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি আমরা জানিয়েছি। তবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়টি আপসহীন। শনিবার বেলা ২টার মধ্যে সরকারকে এই সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। তত দিন পর্যন্ত যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচি স্থগিত রাখতে আমরা সম্মত হয়েছি।
দলের মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, সরকার এই দাবি না মানলে দেশজুড়ে আরও বড় পরিসরে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা জানান, বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য শনিবার সিজেপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আবারও বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
মোদি সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসছে আন্দোলনকারীরা, বিক্ষোভও চলবে : জাতীয় পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে আন্দোলনকারীরা। তবে দেশব্যাপী চলমান প্রতিবাদ কর্মসূচি স্থগিত করা হবে না বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীদের একজন মুখপাত্র। রয়টার্স লিখেছে, সামাজিক আন্দোলনকর্মী সোনাম ওয়াংচুক ২৬ দিন পর অনশন ভাঙায় সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির দায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিল্লির রাজপথে বিক্ষোভ চালিয়ে আসছেন হাজারো তরুণ-তরুণী। তাদের পুরোভাগে রয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজিপি, প্রধান বিচারপতির এক বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে যে সংগঠনের জন্ম হয়েছিল। দলটির মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেছেন, শুক্রবার ‘একটি নিরপেক্ষ স্থানে’ সরকারি মন্ত্রীদের সঙ্গে তাদের বৈঠক হবে। ‘আমরা আশা করি সরকার খোলা মনে আলোচনায় আসবে এবং রাজপথে থাকা দেশের মানুষের কথা শুনবে। আমরা আমাদের দাবিগুলো তাদের কাছে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরব। আমরা আশা করি সরকার আমাদের কথা শুনবে।’ তবে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা পিছিয়ে আসছি না। কারণ, প্রকৃত জাগরণ শুরু হয় একদম তৃণমূল পর্যায় থেকে, আর সেটা আমাদের সত্যিই প্রয়োজন।’
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই আন্দোলনকে তার সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সবচেয়ে বড় যুব প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। প্রধান বিরোধী দলগুলো আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তাতে চলতি সপ্তাহে শুরু হওয়া ভারতীয় পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারের মাধ্যমে শুরুতে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন তরুণকে নিয়ে এই প্রতিবাদের সূচনা হয়েছিল। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ তরুণের সমর্থনে এটি দ্রুত বিশাল সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়, যা মোদী সরকারকে কার্যত অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। এ আন্দোলনের হাজার হাজার সমর্থক সোমবার সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রা শুরু করলে পুলিশ টিয়ার শেল ছুড়ে ও লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর বুধবার রাতে মধ্য দিল্লির যন্তর মন্তরে ১০ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী সমবেত হলে ফের সংঘর্ষ হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে এই বিপুল জনসমর্থনের কারণ শুধু ঘন ঘন প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়, বরং কর্মসংস্থানের অভাবের মত বিষয়গুলো নিয়ে তরুণ ভারতীয়দের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভেরই প্রতিফলন। তারা সরকারকে কার্যকরভাবে এই সংকট সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে।
বিক্ষোভ দমাতে বৃহস্পতিবার মধ্য দিল্লিতে ১৬টি মেট্রো স্টেশন ও মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সীমিত করা হয়, যা হাজার হাজার মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে। এরপর শুক্রবার সকাল থেকেও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ১৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন।
চলতি সপ্তাহে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মত রাজধানী শহরের অন্যতম প্রধান এই গণপরিবহন ব্যবস্থা সাময়িকভাবে স্তব্ধ রাখা হল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বৃহস্পতিবার রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের কঠোর শাস্তির বিধান রেখে বিদ্যমান আইন সংশোধনের লক্ষ্যে শুক্রবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে একটি খসড়া বিল তোলা হবে এবং দ্রুততম সময়ে এটি সংসদে পাস করানো হবে। তবে আন্দোলনকারীরা সরকারের এই খসড়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, শুধু আইন সংশোধন যথেষ্ট নয়, বরং প্রশ্নপত্র ফাঁস স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে শুরুতেই পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।
এদিকে সামাজিক আন্দোলনকর্মী সোনাম ওয়াংচুক বৃহস্পতিবার রাতে অনশন ভাঙার সময় সেখানে উপস্থিত দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে, শুক্রবার ভিডিও বার্তায় তিনি তা বিস্তারিত জানাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের শরীরে ছররা গুলির টুকরো, অস্বীকার পুলিশের : ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভে ছররা গুলি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। দেশটির একটি সরকারি হাসপাতালের প্রতিবেদনে আন্দোলনকারীদের শরীরে ছররা গুলির আঘাতের প্রমাণ মিলেছে। হাসপাতালটি জানিয়েছে, ২৮ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারীর ডান কনুই ও পিঠে ‘পেলেটের আঘাত’ তথা ছররা গুলির টুকরো পাওয়া গেছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২০ জুলাই পার্লামেন্ট অভিমুখে বিক্ষোভ করে সিজেপি। এ সময় বিক্ষোভকারীদের পার্লামেন্টে পৌঁছানো ঠেকাতে দিল্লি পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি। তবে দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
দিল্লির সফদরজং হাসপাতালের এক রোগীর কেস শিটে আঘাতের বিবরণে গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ক্ষতের চারপাশের চামড়া কালো হয়ে গেছে। আঘাতের স্থানে ব্যথা রয়েছে এবং চামড়ায় গুলির টুকরো আটকে রয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ দাবি করেছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ বাহিনী পেলেট গান ব্যবহার করেছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। এনডিটিভি জানিয়েছে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বিক্ষোভকারীকে গত ২০ জুলাই বিকেল ৪টায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেলেট গান ও শক ব্যাটন সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) অধীনস্থ দাঙ্গাবিরোধী ইউনিট র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) ব্যবহার করে থাকে। সোমবার দিল্লি পুলিশের পাশাপাশি যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থলেও তারা মোতায়েন ছিল। যদিও পেলেট গানের ব্যবহার নিয়ে সিআরপিএফ নীরব রয়েছে।
২০১০ সালে কাশ্মীরে সহিংসতা দমনের জন্য প্রথম পেলেট গান ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে তৎকালীন রাজ্য সরকার পরে তা বন্ধ করে দেয়। এরপর ২০১৬ সালের জুলাইয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত হিজবুল মুজাহিদিনের নেতা বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হলে আবারও পেলেট গান ব্যবহার করা হয়।
পেলেট গান থেকে সর্বোচ্চ ৬০০টি ধাতব বা রাবারের পেলেটভর্তি কার্তুজ ছোড়া হয়। এগুলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১,০০০ ফুট বেগে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত অন্তত ৫০০ ফুট দূর থেকে এটি ছোড়া হয়। এ সময় বন্দুকের নল কোমরের নিচের দিকে তাক করে রাখতে হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এক ভিডিওবার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিধানসংবলিত একটি বিল আগামী সপ্তাহে সংসদে পেশ করা হবে। গতকাল শুক্রবার সকালে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রথমে ছাত্রদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত এবং তাদের বিরুদ্ধে পেলেট গান ব্যবহারের নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এদিকে দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধী বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার শান্তিপূর্ণ ছাত্র বিক্ষোভ মোকাবিলায় ‘কাপুরুষতা ও অকারণ নিষ্ঠুরতা’ দেখিয়েছে। সরকার যুবকদের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী হিসেবে না দেখে জাতির শত্রু হিসেবে গণ্য করেছে।
নিবন্ধে ২০ জুলাই পার্লামেন্ট অভিমুখে বিক্ষোভ দমনকে ‘একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেদিন দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। এতে বাড়ি ফেরার পথে থাকা কয়েকজনসহ অনেকেই আহত হন।
২০ জুলাই দিল্লিতে সিজেপির বিক্ষোভ চলাকালে সাহিল লোচাব নামে এক বিক্ষোভকারীর ডান চোখে পেলেটের গুলি লাগে বলে অভিযোগ উঠেছে। দিল্লি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আহত ৬০ জন বিক্ষোভকারীর মধ্যে নজফগড়ের এই কিশোরও রয়েছে।
এনডিটিভি জানিয়েছে, আহত চোখের চিকিৎসা এবং ছররা গুলি অপসারণের জন্য তাঁর একটি অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং তিনি আরেকটি অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। প্রথমে তাঁকে লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিকেল কলেজে এবং পরে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ২১ জুলাই তাঁকে এইমস ট্রমা সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, ওই কিশোরের মুখ, গলা, বুক, ডান কাঁধ ও হাতে একাধিক ছররা গুলির আঘাত রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ছররা তার ডান চোখে বিদ্ধ হয়ে কর্নিয়ায় গভীর ছিদ্র তৈরি করেছে। আরেকটি ছররা তার ডান ফুসফুস ও পেরিকার্ডিয়াল ফ্যাটে (হৃৎপিণ্ডের চারপাশের টিস্যু) পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভ চলাকালে গুরুতর আহত হওয়া একমাত্র বিক্ষোভকারী সাহিল নন। গুরুগ্রামের বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী শেখ মনসুরিও আহত হয়েছেন। তাঁর নাক, কপাল, দুই চোখ ও গালসহ মুখে সাতটি ছররা গুলির আঘাত লেগেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাকে লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তার প্রাথমিক অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে।
সরকার শিক্ষার্থীদের দেশের শত্রু হিসেবে গণ্য করছে -সোনিয়া গান্ধী : চলমান বিক্ষোভ এবং তা মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে কেন্দ্রের তীব্র সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধী। গতকাল শুক্রবার তিনি বলেন, মোদি সরকার বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ‘দেশের শত্রু’ হিসেবে গণ্য করছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু-তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে সোনিয়া গান্ধী বলেন, ছাত্রছাত্রীরা জবাবদিহিতা ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানিয়েছে। তিনি বলেন, ‘কিন্তু মোদি সরকার তাদের সাহসিকতার জবাবে কাপুরুষতা ও উদ্দেশ্যহীন নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে। তাদের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী হিসেবে নয়, বরং জাতির শত্রু হিসেবে গণ্য করেছে।’
সোনিয়া গান্ধী দাবি করেন, ‘কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে কর্মরত’ পুলিশ সদস্যদের দ্বারা ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো ‘নিষ্ঠুরতা’ এই সরকারের জন্য মোটেই নজিরবিহীন নয়। তিনি বলেন, ‘২০২০ সালে সিএএ-এনআরসি বিরোধী বিক্ষোভের সময় সশস্ত্র পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা আমাদের সবারই স্পষ্টভাবে মনে আছে। ভারতের নারী কুস্তিগীরদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ঘটনাগুলোও আমাদের স্মৃতি থেকে কখনোই মুছে যাবে না।’
কংগ্রেসের এ নেত্রী বলেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক অবনতির প্রতিবাদে ভারতজুড়ে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গতি পেয়েছে।
গত ২০ জুলাইকে তিনি একটি কলঙ্কজনক দিন হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, সেদিন দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ) লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের সহিংসভাবে দমন করার চেষ্টা করেছিল।
গান্ধী বলেন, ‘অসংখ্য শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। এমনকি ঘরে ফিরতে থাকা শিক্ষার্থীরাও রেহাই পাননি। কারণ, পুলিশ নির্বিচারে লাঠিচার্জ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘জাতি এমন কিছু তরুণের অত্যন্ত হতাশাজনক দৃশ্য দেখেছে, যাদের শরীর পেলেটের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। এসবের ব্যবহার নিঃসন্দেহে স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অনুমোদনেই হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেদিনের ভিডিওগুলো আমাদের স্মৃতিতে গেঁথে আছে এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এখন উচ্চস্বরে ও স্পষ্টভাবে বলার সময় এসেছে। থামুন, এরা আমাদেরই ছেলেমেয়ে, আমাদেরই তরুণ-তরুণী।’
তিনি সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘অবমূল্যায়নের’ অভিযোগ এনে বলেন, দেশের ছাত্রছাত্রীরা মোদি সরকারের ভণ্ডামি ফাঁস করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা একটি নৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কর্তব্য।
দেড় দশকে ভারতে যেসব গণবিক্ষোভ বদলে দিয়েছে রাজনীতির গতিপথ : ভারতে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের হাজারো সমর্থক গত জুন থেকে টানা বিক্ষোভ করছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির চলমান আন্দোলনকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁস দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতিরই একটি বহিঃপ্রকাশ। তাঁদের ভাষ্য, এই দুর্নীতি ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যু গত দেড় দশকে বারবার মানুষকে রাজপথে নামিয়েছে। ভারত সরকারের কাছে দুর্নীতিবিরোধী আইন প্রণয়নের দাবিতে অধিকারকর্মী আন্না হাজারে দুটি অনশন কর্মসূচি পালন করেন। প্রথমটি শুরু করেন ২০১১ সালের এপ্রিলে। আন্না হাজারের সমর্থনে দেশজুড়ে কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। সে সময় ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার তাঁকে স্বল্প সময়ের জন্য কারাবন্দীও করে। পরে ভারতের পার্লামেন্ট দুর্নীতিবিরোধী একটি আইন পাস করে। তবে হাজারের অভিযোগ ছিল, আইনটি তাঁর মূল দাবিগুলো অনেকটাই খর্ব করে দিয়েছে। তাঁর কয়েকজন সমর্থক ২০১২ সালে আম আদমি পার্টি (এএপি) গঠন করেন। বর্তমানে দলটি পার্লামেন্টে মোদির অন্যতম বিরোধী দল।
নয়াদিল্লিতে চলন্ত বাসে এক তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে জনরোষ ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীতে শুরু হয় ব্যাপক গণবিক্ষোভ। সে সময় বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করেন, পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের দাবি ছিল, নারীর প্রতি সহিংসতা ঠেকাতে ব্যর্থ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও সমাজকাঠামোর আমূল সংস্কার। গণবিক্ষোভ থেকে ধর্ষণকারীদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি ওঠে।
ধর্ষণের ঘটনার কয়েক দিন পর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে ২৩ বছর বয়সী ভুক্তভোগী ওই তরুণীর মৃত্যু হয়। পরে ভারত সরকার যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞা বিস্তৃত করে আইনে সংশোধন আনে এবং এ ধরনের মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে।
ভারতের পার্লামেন্ট নতুন একটি নাগরিকত্ব আইন পাস করে। এর প্রতিবাদে লাখো মানুষ বিক্ষোভে নামেন। সে সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ৭৬ জন নিহত হন।
এই নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইনের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমণ্ডঅধ্যুষিত প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বা এর আগে ভারতে আসা হিন্দু, পারসি, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিষ্টানদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
সমালোচকদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) পাশাপাশি এ আইন মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক এবং এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের চেতনার পরিপন্থি। সীমান্তবর্তী কয়েকটি রাজ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র না থাকা মুসলমানদের নাগরিকত্ব সরকার বাতিল করতে পারে- এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেন অনেকে।
নতুন কৃষি আইনের প্রতিবাদে হাজারো কৃষক ভারতের সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এ আইন কার্যকর হলে সরকার ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে শস্য কেনা বন্ধ করে দেবে। এতে কৃষকদের বেসরকারি ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করতে হবে। তবে মোদি সরকার বলেছিল, এ আইন কৃষি খাতকে পুরোনো আইন থেকে মুক্ত করবে এবং কৃষকদের বড় খুচরা বিক্রেতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের কাছে সরাসরি ফসল বিক্রির সুযোগ দেবে। এরপরও কৃষকেরা এ আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনের চাপে সরকার নতুন আইন প্রত্যাহার করে নেয়।
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অপেক্ষাকৃত তরুণ সদস্য নিয়োগ এবং পেনশন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নিয়োগব্যবস্থায় পরিবর্তনের ঘোষণা দেয় সরকার। এর প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। রেলপথ অবরোধ করা হয় বিভিন্ন স্থানে।
নিয়োগপ্রত্যাশী, সাবেক সেনাসদস্য ও বিরোধী নেতারা ৪ বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরোধিতা করেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, চার বছরের চাকরির মেয়াদ শেষে বিকল্প কর্মসংস্থান পাওয়া কঠিন হবে। তবে মোদি সরকার নিয়োগব্যবস্থা পরিবর্তনের কর্মসূচি প্রত্যাহার না করলেও চার বছর দায়িত্ব পালনকারীদের জন্য সরকারি চাকরির ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষণের ঘোষণা দেয়।
কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে প্রশিক্ষণরত এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর হাজারো চিকিৎসক রাজপথে নেমে আসেন। তাঁরা মাসের পর মাস বিক্ষোভ করেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ওই নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
২৬ দিন পর অনশন ভাঙলেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক : সরকারের সঙ্গে ‘দীর্ঘ আলোচনার পর এবং সহিংসতা এড়াতে’ অবশেষে ২৬ দিন পর অনশন ভাঙলেন ভারতের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। এনডিটিভি জানিয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এমন আশ্বাস পেয়ে তবেই ওয়াংচুক গুরুগাঁওয়ের মেদান্তা হাসপাতালে তার অনশন শেষ করেছেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে বেশ কয়েক দফা দাবিতে ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে এখনো ধর্নায় আছে ককরোচ জনতা পার্টির সদস্যরা।
ওয়াংচুকের অনশনের কারণ ভারতের মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নফাঁসের ঘটনা। প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে যুব সংগঠন সিজেপির সমর্থনে গত ২৮ জুন থেকে অনশনে বসেছিলেন ৫৯ বছর ওয়াংচুক। টানা অনশনের ফলে এর মধ্যে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। অনশনের ২১ দিনের মাথায় তাকে হাসপাতালেও ভর্তি করে কর্তৃপক্ষ। অবশেষে ২৭ দিনের মাথায় অনশন ভাঙলেন ওয়াচুক।
