পদত্যাগী রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে তদন্ত করবে না বাংলাদেশ ব্যাংক

মুখপাত্র

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সদ্য পদত্যাগ করা মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আলাদা কোনো অনুসন্ধান চালাবে না বলেছেন নিয়ন্ত্রয়ক সংস্থাটির মুখপাত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, পদত্যাগী রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো তদন্ত না হলেও পুরনো কোনো ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গতকাল রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন মুখপাত্র। গত শুক্রবার পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে নির্বাচিত হয়েছিলেন। মেয়াদ শেষ হওয়ার পৌনে দুই বছর আগেই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে যান। পদত্যাগের দুই দিন পর তিনি বঙ্গভবন ছেড়ে গুলশানে নিজের বাসায় উঠেছেন। রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইনকিলাব মঞ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন বলেন, “সাহাবুদ্দিন সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে ছিলেন, তাই তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে আলাদা কোনো অনুসন্ধান চালাবে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ‘তবে দেশের আর্থিক খাতের সংস্কারে ব্যাংকভিত্তিক যে তদন্তগুলো চলছে, সেখানে কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেসরকারি পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। একীভূত করার আগে এই পাঁচ ব্যাংকের ওপর বিশেষ ‘ফরেনসিক অডিট’ বা আর্থিক লেনদেনের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা হয়। এর বাইরেও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ওপরও একই ধরনের তদন্ত করা হয়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে অর্থাৎ ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাহাবুদ্দিন এ ব্যাংকের ভাইস-চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের জেএমসি বিল্ডার্সের পক্ষে ২০১৭ সালের জুনে ব্যাংকটির পরিচালক নিযুক্ত হন। এর আগে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প গ্রুপ এস আলম গ্রুপ। জেএমসি বিল্ডার্সের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে দেখানো হলেও বাস্তবে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটি যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে নিবন্ধন নেয়। আবাসন খাতের বড় প্রতিষ্ঠান দাবি করা হলেও আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবসহ অন্য কোনো সংগঠনের সদস্য নয় এই জেএমসি বিল্ডার্স।

কোম্পানিটি এস আলম গ্রুপের বেনামি প্রতিষ্ঠান বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। বেসরকারি আরেকটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই অর্থে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কিনে পরিচালক হয় জেএমসি বিল্ডার্স। পর্ষদের সদস্য হিসেবে প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে পাঠানো হয় মো. সাহাবুদ্দিনকে। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি ঋণ কেলেঙ্কারিগুলো হয়। অভিযোগ রয়েছে, ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত ২৪টি কোম্পানি ইসলামী ব্যাংকের মোট শেয়ারের মধ্যে ৮১ শতাংশের মালিক বনে যায়। ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-বিএফআইইউ এই ২৪ কোম্পানির নাম পায়।

উচ্চ আদালতে এ বিষয়ে বিএফআইইউ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদককে তা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

তদন্ত চলাকালে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় নাম আসা অভিযুক্তদের বিদেশ সফরেও নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত। আগামী বুধবার এই বিষয়ে শুনানি করার পরবর্তী তারিখ দিয়ে রেখেছে উচ্চ আদালত।

ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের সাবেক সদস্য হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের নামও আলোচিত হচ্ছে সেই মামলায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, “গ্রাহকরা ব্যাংকের কাস্টমার। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকে ‘ইন্সপেকশন’ করে। তদন্তের সময় কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কোনো ব্যক্তি অনিয়ম করলে, সেই অনিয়মের সাথে পর্ষদ জড়িত কিনা সেটাও দেখা হয়।” তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কোনো ব্যক্তি বিশেষকে ‘টার্গেট’ করে অনুসন্ধান করে না। কোনো ঘটনার অনুসন্ধানে কারো নাম বেরিয়ে এলে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। ‘উদ্দেশ্যপ্রণদিতভাবে’ কারো বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো হয় না তুলে ধরে আরিফ হোসেন বলেন, “প্রতিটা ব্যাংক নিজেরাই অডিট করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকও করে এবং এক্সটার্নাল (বহিঃখাত) অডিটও হয়। এটা কোনো ব্যক্তি বিশেষকে টার্গেট করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক করবে না। বিশেষ প্রায়োরিটি নিয়ে কিংবা টার্গেট করে কাজ করছে, এমন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”

রাষ্ট্রপতি পদে নাম আলোচনায় আসার পরে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক পদ ছাড়েন মো. সাহাবুদ্দিন। সেই সময়ে অর্থাৎ ২০২৩ সালে ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন এস আলমের ছেলে আহসানুল আলম। চব্বিশের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে ডজন খানেক ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। ওই সময় ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে সাজায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গেল দুই বছরে দুই বার পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পর এখনো পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠন করা হয়নি। এক সদস্য বিশেষ্ট কমিটি দিয়ে চলছে বেসরকারি খাতে বড় ব্যাংকটি।