শাপলা চত্বর হত্যা মামলায় আসামি শেখ হাসিনাসহ ৪১

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এ মামলায় ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল সোমবার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। এ ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৬ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা ছাড়াও এ মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজীর আহমেদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক, একাত্তর টিভির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা।

২০১৩ সালের মে মাসে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে ৫৭ জনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ৪ মে এ তথ্য জানিয়েছেন।

শাপলা চত্বর হত্যা মামলায় শেখ হাসিনা-আজিজ-বেনজীরসহ আসামি হলেন যারা : ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।

এর আগে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। এ মামলায় মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের তৎকালীন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, দলটির শীর্ষ নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক ও তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন।

মামলার আসামিদের মধ্যে শেখ হাসিনা ছাড়াও রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, সাবেক যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ।

এ ছাড়া আসামির তালিকায় রয়েছেন গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, সাংবাদিক ফারজানা রুপা, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, তৎকালীন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) মো. আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এসএম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিএম ফরমান আলী।

এ মামলায় বর্তমানে ১১ আসামি গ্রেপ্তার রয়েছেন বলে জানা যায়। তারা হলেন- হাসানুল হক ইনু, আব্দুর রাজ্জাক, দীপু মনি, শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম, শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল হক বাবু। এর আগে চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনায় ৫৮ জন নিহত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। ২০১৩ সালের ৫ মে দিনভর হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ শেষে রাতে শাপলা চত্বরে অবস্থান নেওয়া নেতাকর্মীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়। ৫ আগস্টের পর এ ঘটনায় তদন্ত চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেয় হেফাজতে ইসলাম।

শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড ছিল গণহত্যা : রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা আখ্যা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। গতকাল সোমবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, হেফাজতে ইসলামকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন সরকারের পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ মিলে একটি নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। তবে ঘটনার পর এ নিয়ে করা মামলাটির কোনো তদন্তকাজ চালানো হয়নি। বহু চেষ্টা করা সত্ত্বেও এই হত্যাকাণ্ডের কোনো তদন্ত বা বিচার পায়নি হেফাজতে ইসলাম। অবশেষে এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বভার নেওয়ার পর চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছি। দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেননা শিশুসহ আলেমণ্ডওলেমাদের নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। এটি জেনোসাইড তথা গণহত্যা ছিল। দেশের ইতিহাসে এমন বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড কখনও ঘটেছে বলে জানা নেই।

আমিনুল ইসলাম বলেন, কিছু ব্লগার বা নাস্তিকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একটি ইসলামিক গোষ্ঠী বা একটি ইসলামিক গ্রুপকে নির্মূল করে দেওয়ার জন্য হেফাজতে ইসলামের মতো একটি সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ চালায় তৎকালীন সরকার। আমরা মোট ৬১ জন শহিদের তালিকা পেয়েছিলাম। এর মধ্যে ৫৮ জনের নামণ্ডঠিকানা শনাক্ত করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আজ দুটি ঘটনার ওপর আমরা চার্জ দিয়েছি। একটি হলো শাপলা চত্বরে ৫ মে মধ্যরাতে নারকীয় ঘটনায় ৩২ জন শহিদ, আরেকটিতে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জন মানুষকে হত্যা করার ঘটনা আনা হয়। আর এ সবকিছুই জেনোসাইড ছিল। এই দুটি চার্জে আমরা ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছি। তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।