রাবিতে তিন শিক্ষার্থীকে আম্মার ও ছাত্রশিবিরের মারধর

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীকে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মারধরের ঘটনাকে ‘মব’ বলে আখ্যায়িত করে এর বিচার দাবি করেছে ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল কয়েকটি ছাত্র সংগঠন।

গত সোমবার দুপুরে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে এ ঘটনার পর পরই ছাত্রদল বিক্ষোভ মিছিল করে। পরে রাতে ছাত্র ফেডারেশন ও বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট’ তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।

কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ঢুকে ‘সন্ত্রাসী কায়দায়’ শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনায় তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রদল। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করে এভাবে শিক্ষার্থীদের মারধর করে তারা ক্যাম্পাসে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়। আমাদের সুস্পষ্ট দাবি হল, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দোষী প্রত্যেককে শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে এভাবে ‘মব’ করে কোনো মোনাফেক সংগঠন কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে।

‘গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট’ তাদের বিবৃতিতে বলেছে, প্রক্টর কার্যালয় ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে রাকসু নেতা ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা ‘মব ভায়োলেন্স’ করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ওই ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি না করে, পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ স্থান কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে যেভাবে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে পেটানো হযেছে তা কোনো সুস্থ ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাসের চিত্র হতে পারে না। এই বর্বরোচিত ঘটনার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।

এ সময় গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট ‘ছাত্রলীগ কর্তৃক রাকসু ভবনে হামলার’ তদন্ত ও বিচার; একইসঙ্গে ‘মব ভায়োলেন্সের’ সঙ্গে জড়িত রাকসু ও ছাত্রশিবিরের দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থার দাবি জানায়।

জোটের নেতারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিসহ পুরো ক্যাম্পাসে পড়াশোনার স্বাভাবিক ও ভীতিহীন পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।

এ ঘটনায় দেওয়া বিবৃতিতে ছাত্র ফেডারেশন অভিযোগ করেছে, পুরো সহিংসতার ঘটনা প্রশাসনের সামনে ঘটলেও তারা ছিল ‘নীরব দর্শক’।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সংস্কৃত বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থীকে ছুরি দেখিয়ে পদ্মা নদীতে ফেলে দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।

‘কিন্তু একটি তদন্তাধীন ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে যে ‘মব ভায়োলেন্স’ তথা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মহোৎসব চললো, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

ছাত্র ফেডারেশন বলছে, ‘রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে বা অভিযোগের সুযোগ নিয়ে প্রক্টর অফিস ও রাকসু ভবনে এ ধরনের সহিংসতা ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তাহীনতারই প্রমাণ দেয়। খোদ প্রক্টরের চোখের সামনে লাইব্রেরিতে ঢুকে মানুষ পেটানো হচ্ছে, অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে মারা হচ্ছে- অথচ প্রশাসন সেখানে নীরব দর্শক।

‘শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম নিরাপত্তা দেওয়ার সদিচ্ছা বা ক্ষমতা যদি এই প্রক্টরিয়াল বডির না থাকে, তবে তাদের পদে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার নেই।’

এ সময় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিচারের দাবিও জানায় ছাত্র ফেডারেশন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সোমবার সকালে এক নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তার একটি ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট ছাত্রকে নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। এ সময় রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বির দপ্তরে উপস্থিত হন।

পরে তারা দুজন রোববার রাতে প্রক্টরের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে আনাসকে প্রক্টর দপ্তরে ডাকেন। আনাস উপস্থিত হলে দুই পক্ষের কথা কাটাকাটির মাঝেই আনাসকে চড়-থাপ্পড় দেন জিএস ও এজিএস। এ সময় তাকে ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের দাবিও তোলেন রাকসুর এই দুই নেতা। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় প্রক্টর আনাসকে ছেড়ে দেন।

তবে ছাড়া পাওয়ার পর আনাস তার কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে রাকসু কার্যালয়ে হামলা করেন বলে দাবি করেন জিএস সালাউদ্দিন আম্মার।

পরে রাকসু এবং ছাত্র শিবির নেতারা তাদের ধাওয়া করলে তারা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে আশ্রয় নেন। এ সময় রাকসুর জিএস আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস শাকিব, বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর, সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি ফাহিম রেজা ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র শিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে তাদের উপর হামলা করা হয়। এ সময় রিডিং রুমে অবস্থান করা শিক্ষার্থীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদেরকেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে লাইব্রেরির পরিচালক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আনাস ও তার সঙ্গী দুইজনকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিতে গেলে জিএস আম্মারের নেতৃত্বে তাদের নামিয়ে ফের মারধর করা হয়।

রাতে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আনাস এবং সংস্কৃত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসানকে ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ আগের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এদিকে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঘটনার দিন গত সোমবার রাতে প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রশাসন। মঙ্গলবার কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।