রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্য অর্জনে মাঠে এনবিআর

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ। স্বাধীনতার পর এবারই সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় এই লক্ষ্য প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পর এবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কঠোর হচ্ছে এনবিআর। বিশেষ নজরদারি এবং বড় কর ফাঁকি উদ্ঘাটনের মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায় সংস্থাটি।

সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর আহসান হাবিব একাধিক বৈঠক করেন এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে। এসব বৈঠকে প্রাধান্য পেয়েছে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, করজাল বাড়ানো ও কর ফাঁকি রোধ করার মতো বিষয়।

জানা গেছে, কর্মকর্তাদের মনোবল বাড়াতে এবারই প্রথম মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে একাধিক কর্মকর্তাকে এপ্রিসিয়েশন লেটার বা ভালো কাজের প্রশংসাপত্র পাঠানো হয়েছে। এছাড়া কর্মকর্তাদের নিয়মিত ব্রিফ করছেন এনবিআর চেয়ারম্যান।

রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর ও ভ্যাট ফাঁকি রোধে মাঠপর্যায়ে অভিযান জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে উৎসে কর (টিডিএস) যথাযথভাবে কর্তন ও জমা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে ব্যাপক ক্ষমতা। তবে এসব পদক্ষেপ ঘিরে ব্যবসায়ী সমাজে উদ্বেগও বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, অটোমেশন ছাড়া কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হলে হয়রানি ও দুর্নীতির ঝুঁকি আরও বাড়বে।

গত ১৯ জুলাই এনবিআরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, উৎসে কর আদায় যাচাই করতে কর্মকর্তারা যে কোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন। প্রয়োজন হলে হিসাবের বই, ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, আর্থিক নথি, কম্পিউটার, ক্লাউড সার্ভার এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষা করা যাবে। এমনকি প্রয়োজন হলে ইলেকট্রনিক তথ্য সাময়িকভাবে জব্দ করারও ক্ষমতা থাকবে। পরিদর্শনে বাধা দিলে আয়কর আইনের ১৪৭(২) ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এই ক্ষমতার উদ্দেশ্য ব্যবসায়ীদের হয়রানি নয়, বরং যারা উৎসে কর কর্তন করেও সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছেন না কিংবা তথ্য গোপন করছেন, তাদের চিহ্নিত করা। সংস্থাটি জানিয়েছে, কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে অভিযোগ জানানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। জানতে চাইলে এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল-আমিন শেখ জাগো নিউজকে বলেন, ধারা ১৪৭ সংক্রান্ত যে কোনো হয়রানি, অস্পষ্টতা কিংবা সংক্ষুব্ধতায় সরাসরি এনবিআরের ১৪৭ ধারা সংক্রান্ত কমিটির সদস্যসচিব বরাবর ই-মেইলে জানানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এ ব্যাখ্যায় আশ্বস্ত নয়। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের মতে, টিডিএস ব্যবসায়ীদের কর নয়; তারা কেবল সরকারের হয়ে কর সংগ্রহ করে। তাই এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো সুশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি অভিযোগ করেন, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা গেলে তার অপব্যবহারের আশঙ্কাই বেশি।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও টিডিএস সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি হয়নি। এমন অবস্থায় নথিপত্র ও কম্পিউটার জব্দের মতো ক্ষমতা প্রয়োগ ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তার ভাষায়, কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বেশি কার্যকর হবে।

রাজস্ব আদায়ের বড় অংশ আসবে ভ্যাট খাত থেকে। চলতি অর্থবছরে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক মিলিয়ে ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্য অর্জনে এনবিআর এরই মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাসে ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন রয়েছে এবং ভ্যাট ফাঁকির ঝুঁকি বেশি- এমন প্রায় ৮ হাজার প্রতিষ্ঠানকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে অতিরিক্ত ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি বছরে ১ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট প্রদানকারী প্রায় ২ হাজার বড় করদাতার ওপরও আলাদা নজরদারি চালিয়ে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যান্য উৎস মিলিয়ে শুধু ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটনের মাধ্যমেই অতিরিক্ত ৩৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর।