শাপলা চত্বরের মামলায় লতিফ সিদ্দিকী কারাগারে

প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে শাপলা চত্বরে ‘হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ বৃহস্পতিবার দুপুরে এ আদেশ দেন। প্যানেলের অন্য দুই বিচারক হলেন মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। গত বুধবার সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার করা লতিফ সিদ্দিকীকে এদিন দুপুরে গোয়েন্দা পুলিশের একটি মাইক্রোবাসে করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। আসামিপক্ষে কোনো জামিনের আবেদন না থাকায় রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত।

আদালতের আদেশ শেষে ট্রাইব্যুনাল থেকে লতিফ সিদ্দিকীকে হাতকড়া পরিয়ে বের করা হয়। পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কারাগারে। এ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে লতিফ সিদ্দিকীকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে তার ভাই কাদের সিদ্দিকী বলেন, রাজনৈতিক জীবনে তাদের বহুবার হ্যান্ডকাফ পরতে হয়েছে, তাই একে তারা ‘বিয়ের চুড়ির’ মতই মনে করেন।

শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, জহিরুল আমিন ও তারেক আবদুল্লাহ। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবদুল্লাহ আল হারুন ভূঁইয়া। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ১৩ বছর আগে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ‘হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে গত ২৭ জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে প্রসিকিউশন।

ট্রাইব্যুনাল সেদিন তা আমলে নিয়ে আসামিদের মধ্যে ‘পলাতক’ ৩১ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পাশাপাশি কারাগারে থাকা ১০ আসামিকে হাজিরের নির্দেশ দেয়। এ মামলার আসামির তালিকায় সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর নাম রয়েছে ১০ নম্বরে। গত বুধবার সকালে শাহবাগ থানার এক মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে লতিফ সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, যেহেতু তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার না করলে তিনি নিজেই ‘আত্মসমর্পণ’ করবেন।

শাপলা চত্বরের ঘটনার বিষয়ে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘আমি তখন মন্ত্রী ছিলাম। কিন্তু শাপলা চত্বরের ঘটনা বা সে সময়কার কোনো বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’ এরপর গত বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় গোয়েন্দা পুলিশ। বৃহস্পতিবার দুপুরে হাজির করা হয় ট্রাইব্যুনালে।

লতিফ সিদ্দিকীর আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল হারুন ভূঁইয়া রাসেল সাংবাদিকদের বলেন, আদালত তাকে তার মক্কেলের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দিয়েছে।

‘আমরা আবার কোর্টের পারমিশন চেয়েছিলাম, উনি কোর্টকে অ্যাড্রেস করে কিছু কথা বলতে চান। কোর্ট উনাকে সেই পারমিশনটা অ্যালাউ করেনি। কোর্ট বলেছে যে নেক্সট ডেটে যখন আসবে তখন পারমিশন দেবে, তখন কথা বলতে পারবে।’

লতিফ সিদ্দিকীর জামিনের আবেদন করা হবে কি না জানতে চাইলে তার আইনজীবী বলেন, ‘আমরা পরবর্তীতে জামিন আবেদন করব।’ লতিফ সিদ্দিকী গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ পর প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলামও সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, ‘আসামি পক্ষে যেহেতু কোনো জামিনের আবেদন ছিল না, তখন আমাদের আবেদন মোতাবেক এবং কগনিজেন্স অনুযায়ী তাকে কাস্টডিতে নেওয়া হয়েছে এবং জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।’

লতিফ সিদ্দিকীর আদালতে কথা বলতে চাওয়ার বিষয়ে প্রসিকিউটর বলেন, আসামির আইনজীবী ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করেছিলেন যে তিনি কথা বলতে চান।

‘তখন ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, ‘আজকে কথা আমরা শুনতে পারছি না, সামনের ধার্য তারিখে আপনার কথা শুনব’।’

শাহবাগের আন্দোলনের বিপরীতে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম। সেদিন সেই সমাবেশ ঘিরে পুরো মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা আর তাণ্ডব চলে। পরে সেই রাতে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের মতিঝিল থেকে সরানো হয়।

চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২০ অগাস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্মমহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী। এর ভিত্তিতে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়।

লতিফ সিদ্দিকীকে কীভাবে এ মামলায় আসামি করা হল, সেই প্রশ্নে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘তিনটে বাহিনী- র‍্যাব, পুলিশ এবং বিজিবির সমন্বয়ে ব্ল্যাকআউট করে যৌথ অপারেশনের মাধ্যমে হেফাজত কর্মীদের ওইখান থেকে অপসারণ করা হয়। ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজনকে হত্যা করা হয়... মোট ৬১ জনকে হত্যার তথ্য আমরা পেয়েছি।’

প্রসিকিউটর দাবি করেন, ওই অভিযানের আগে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ধানমন্ডির কার্যালয়ে দলের প্রভাবশালী নেতা ও নীতিনির্ধারকদের একটি বৈঠক হয়। সেখানে লতিফ সিদ্দিকীও উপস্থিত ছিলেন। ‘পরে বৈঠকের সিদ্ধান্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) কাছে জানানো হয় এবং তারই ধারাবাহিকতায় অভিযান পরিচালিত হয়।’

মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘বৈঠকে উনি (লতিফ সিদ্দিকী) একজন পার্টিসিপেন্ট ছিলেন। উনাদের এই সিদ্ধান্ত, পরামর্শ ও উসকানি গ্রহণ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী যে নারকীয় নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছিলেন, তার পরামর্শদাতা, উসকানিদাতা এবং সিদ্ধান্তদাতার মধ্যে উনি একজন।’