সুসংবাদ প্রতিদিন
চান্দিনার মাঠে মাঠে আউশ ধানের সোনালি হাসি
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

সবুজ পাতা পেরিয়ে থোকা থোকা সোনালি ধান এখন হেলেদুলছে বাতাসের তালে তালে। কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে এখন শুধুই সোনালি রোদের ঝিলিক আর পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই যেন দিগন্তজোড়া সোনালি গালিচা বিছিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। বৈরী আবহাওয়া ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এবার চান্দিনার মাঠে মাঠে আউশ ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো এই সোনালি ফসল ঘরে তোলার আনন্দে এখন বুক ভাসছে উপজেলার হাজারো কৃষক পরিবারের।
আষাঢ়-শ্রাবণের রিমঝিম বৃষ্টির মধ্যেই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে শুরু হয়ে গেছে আউশ ধান কাটার ব্যস্ততা। খুব ভোর থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাঠেই কাটছে কৃষকদের সোনালি প্রহর। কোনো মাঠে ধান কাটার কাস্তে চলছে তড়িৎ গতিতে, আবার কোনো মাঠে ধান মাড়াই আর রোদে শুকানোর তোড়জোড়। কৃষকের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কিষাণীরাও পিছিয়ে নেই; ধান মাড়াই, ঝাড়াই এবং আঙিনায় ধান শুকাতে সাহায্য করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। পুরো গ্রামজুড়ে এখন যেন এক উৎসবের মেজাজ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আউশ ধান। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে আউশ ধানের ফলন অনেকটাই ভালো হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির অভাব কিংবা শেষ সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির শঙ্কা থাকলেও সঠিক পরিচর্যা এবং আউশ ধানের মানসম্মত বীজের কল্যাণে ফলনে কোনো ঘাটতি পড়েনি। পোকাণ্ডমাকড়ের আক্রমণও ছিল তুলনামূলক কম। সরকারের কৃষি প্রণোদনা ও পরামর্শে কৃষকরা সঠিক সময়ে বীজ রোপণ ও সার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। ফলে এবার ছড়াভরা ধান দেখে কৃষকের মন খুশিতে ভরে উঠেছে। প্রতি বিঘায় ধানের যে ফলন পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বিগত দিনের সব শ্রম আর কষ্ট এক নিমেষেই মুছে গেছে বলে জানান প্রবীণ এক কৃষক। আউশ মূলত বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল ধান হলেও চান্দিনার কৃষকরা আধুনিক সেচব্যবস্থা ও উফশী জাতের ব্যবহারের মাধ্যমে এর উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন। ব্রিশাইল, ব্রি ধান-৪৮, ব্রি ধান-৯৮ সহ উচ্চফলনশীল জাতগুলোর চাষ এবার চান্দিনায় চোখে পড়ার মতো। অল্প পুঁজিতে ও স্বল্প সময়ে ভালো ফলন পাওয়া যায় বলেই দিন দিন আউশ চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। তাছাড়া রোপা আমন আর বোরো ধানের মাঝামাঝি সময়ে আউশ চাষ করায় জমি ফেলে না রেখে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন তারা। ফসল তোলার পর এই জমিতেই আবার আমনের রোপণ শুরু হবে, যা কৃষির চক্রকে সচল রাখছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা ও সার্বিক সহায়তার ফলে চাষিরা এবার বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে আউশ আবাদ করতে পেরেছেন। প্রণোদনা হিসেবে বিনামূল্যে সার ও উন্নত জাতের বীজ পাওয়ায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উৎসাহ বহুলাংশে বেড়ে গিয়েছিল। তাদের মতে, সঠিক ধান গোলায় তুলতে পারলে শুধু পরিবারের চাহিদা পূরণই হবে না, বরং বাজারে ভালো দামে বিক্রি করে সংসারের অন্য প্রয়োজনগুলোও মেটানো সম্ভব হবে। গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে সারি বেঁধে ধান নিয়ে বাড়ি ফেরার দৃশ্য কিংবা উঠোনে ধান শুকানোর ছবি যেন বাংলার আবহমান রূপকেই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। সোনালী আউশ ধানের বুকচেরা হাসিতে তাই আজ চান্দিনার কৃষকের ঘরে ঘরে ফুটে উঠেছে স্বস্তির ঝিলিক। ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে এই একমুঠো ধানই এখন তাদের আগামী দিনের স্বপ্ন বুননের মূল প্রেরণা।
