‘আমি ভারতীয় আমাকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে’

প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া এলাকায় আবুল বাসারের বাড়িতে বসে কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন ৪৫ বছর বয়সী সাহিদা ফকির। ভারতে থাকা নিজের পরিবারের কাছে ফিরতে না পেরে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। সাহিদা জানান, তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার স্বরূপনগর থানার বিথারি হাকিমপুর গ্রামের বাসিন্দা। সম্প্রতি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাকে আসাম সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে (পুশইন) পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি আমার পরিবার, ঘরবাড়ি ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। নিজের দেশেও আর ফিরতে পারছি না।’ প্রায় ২০ বছর আগে কাজের সন্ধানে স্বামী জুম্মান ফকিরকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুম্বাইয়ে যান বলে জানান সাহিদা। সেখানে তিনি গৃহকর্মী হিসেবে ও তার স্বামী গাড়ি পরিষ্কারের কাজ করতেন। তাদের ২৩ ও ১৩ বছর বয়সী দুই ছেলে বর্তমানে ভারতে রয়েছে।

সাহিদা আরও জানান, তার বাবা আমিনউদ্দিন গাজী ও মা মাজিদা বিবি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার স্বরূপনগর বিধানসভা এলাকার নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন।

তার দাবি, ভোটার আইডি কার্ড, আধার কার্ড ও আয়কর বিভাগের দেওয়া পার্মানেন্ট অ্যাকাউন্ট নম্বর (প্যান) কার্ড-সবগুলোতেই স্বরূপনগরের ঠিকানা রয়েছে। এছাড়া স্বরূপনগর থানাধীন গুনরাজপুর মৌজায় তার নিজের জমিও রয়েছে। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সাহিদা বলেন, গত ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ে বাসার কাছের একটি বাজারে খাবার কিনতে গেলে কয়েকজন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে আটক করেন। সেসময় তার সঙ্গে রাতের খাবারের জন্য ছয়টি রুটি ও তরকারি ছিল। তার ছোট ছেলে তখন বাসায় একা ছিল। পরে তাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে অবৈধ বিদেশি সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের রাখা হতো।

সাহিদার অভিযোগ, আইনি কিংবা আদালতের কোনো কাগজপত্র না দেখিয়েই ওই লোকেরা তার মোবাইল ফোন, আধার কার্ড ও খাবার নিয়ে নেন। এরপর কোনো তদন্ত, শুনানি, নোটিশ বা আদালতের আদেশ ছাড়াই তাকে বাংলাদেশি ঘোষণা করা হয়। পাঁচ দিন আটকে রাখার পর তাকে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তিনিসহ প্রায় ২০ জনকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন স্থানে ঘোরানোর পর সীমান্তের একটি অংশ দিয়ে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। সাহিদা ফকিরের ভাষ্য, পরে তিনি বাংলাদেশের ফেনীতে পৌঁছান। সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গা হয়ে বেনাপোল এলাকায় আসেন। পরে সেখানে আবুল বাসারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মানবিক কারণে আবুল বাসার তাকে নিজের সাতক্ষীরার বাড়িতে আশ্রয় দেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত ভারতে ফেরার আবেদন জানান সাহিদা। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) এ বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছে। সংগঠনটি প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংযুক্ত করে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) কাছে চিঠি পাঠিয়ে ওই নারীকে সাহায্য করার অনুরোধ জানিয়েছে।

আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘আমাদের একজন মানবাধিকারকর্মী সেখানে গিয়ে ওই নারীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি একজন ভারতীয় নাগরিক বলে আমাদেরকে জানিয়েছেন।’ কবির বলেন, ‘বাংলায় কথা বলার কারণে একজন নারীকে ‘বাংলাদেশি’ বলে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা শুধু একজন মানুষের প্রতি অন্যায় নয়; এটি ভাষাগত বৈষম্য, মানবিক মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।’ তিনি আরও বলেন, ‘আরও বিস্ময়কর হলো, নিজ দেশের একজন নাগরিকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এমন আচরণ। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া একজন নাগরিককে ভিনদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা, অপমান করা বা সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে জোর করে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা কোনো গণতান্ত্রিক আচরণ হতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে এমন আচরণ মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী এবং নিষ্ঠুর বলেই বিবেচিত হয়ে থাকে।’ ‘একজন নারীর ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিজ্ঞতা আরও বেশি উদ্বেগের। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উচিত ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত করে ওই নারীকে অবিলম্বে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে তার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা,’ যোগ করেন কবির। আবুল বাসার জানান, তিনি চিকিৎসার জন্য বেনাপোলে গিয়েছিলেন। সেখানে সাহিদা ফকিরের সঙ্গে তার দেখা হয়। তিনি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন এবং তার কাছে সাহায্য চান। কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর সেখানে একজন উপপরিদর্শক (এসআই) পাঠানো হয়েছে।