ব্রড পিকে তুষারধস

নির্মল পুরজাসহ ৮ পর্বতারোহীর মৃত্যু

প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মানুষের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে অসম্ভবকে সম্ভব করার নাম ছিল নির্মল পুরজা। বিশ্বজুড়ে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘নিমস দাই’ নামে। মাত্র ছয় মাস ছয় দিনে বিশ্বের ১৪টি আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত জয় করে যিনি পর্বতারোহণের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখেছিলেন, সেই কিংবদন্তিই এবার হারিয়ে গেলেন নিজের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা- পর্বতের বুকেই।

পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকে ভয়াবহ তুষারধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩ বছর বয়সী এ নেপালি পর্বতারোহী। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে তার অভিযাত্রা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এলিট এক্সপেডিশন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অভিযানে থাকা অন্য সদস্যদেরও জীবিত থাকার সম্ভাবনা নেই।

তুষারধসের পর পাকিস্তানের উদ্ধারকারী দল টানা অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত আট জনের লাশ উদ্ধার করেছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন আরও দুই পর্বতারোহী। দুর্গম এলাকা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুটি এভিয়েশন হেলিকপ্টার উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছে।

গত ৩০ জুলাই বিশ্বের অন্যতম কঠিন পর্বত ব্রড পিক অভিযানে অংশ নেন নির্মল পুরজা। দলটিতে নেপালের পাঁচজন শেরপাসহ পাকিস্তান, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং অন্য দেশের পর্বতারোহীরা ছিলেন। ৩১ জুলাই শৃঙ্গ জয়ের পথে ভয়াবহ তুষারধসে পুরো দলটি আটকা পড়ে। এরপর থেকেই তাদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ট্র্যাকিং ডেটায় দেখা যায়, তুষারধসের পর দলের সদস্যদের অবস্থান দ্রুত নিচের দিকে নেমে যায়। কিছু সময় পর সংকেত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

নেপালের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ও নির্মল পুরজার ব্যবসায়িক অংশীদার মিংমা গিয়াবু শেরপা জানান, ট্র্যাকিং তথ্য থেকেই প্রথমে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। পরে উদ্ধার অভিযানে একে একে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়।

নেপালের মিয়াগদি জেলার দানা গ্রামে ১৯৮৩ সালের ২৫ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন নির্মল পুরজা। নেপালের বিশেষ বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের পর তিনি যুক্তরাজ্যের অভিজাত স্পেশাল ফোর্সেও কাজ করেছিলেন। কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণই তাকে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন পর্বত অভিযানের জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত করে।

২০১৯ সালে তিনি শুরু করেন আলোচিত ‘প্রজেক্ট পসিবল’। লক্ষ্য ছিল সাত মাসের মধ্যে বিশ্বের ১৪টি আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত জয় করা। কিন্তু সবাইকে বিস্মিত করে তিনি সেই লক্ষ্য পূরণ করেন মাত্র ছয় মাস ছয় দিনে। এতে সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে অক্ষুণ্ণ থাকা আগের বিশ্বরেকর্ড ভেঙে যায় এবং নির্মল পুরজা বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।

তার জীবন ও সাফল্য নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ১৪ Peaks: Nothing Is Impossible বিশ্বব্যাপী লাখো দর্শককে অনুপ্রাণিত করেছে।

নির্মল পুরজার দর্শন ছিল একটাই- মানুষের সীমাবদ্ধতা আসলে মানসিক।

২০১৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, শারীরিক সক্ষমতার দিক থেকে আমি ভাগ্যবান। তবে পৃথিবীর সেরা ইউনিটের কাছ থেকে প্রশিক্ষণও পেয়েছি। এর সঙ্গে যদি ইতিবাচক মানসিকতা যোগ হয়, তাহলে আপনি যেকোনো কিছু করতে পারবেন।

এ বিশ্বাস নিয়েই তিনি বারবার মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম পর্বতগুলোতে অভিযান চালিয়েছেন।

কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিক বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক আট হাজারি পর্বত। খাড়া বরফঢাল, অস্থিতিশীল হিমবাহ, আকস্মিক তুষারধস এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে এটি অভিজ্ঞ পর্বতারোহীদের কাছেও ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অভিযাত্রীরা এ শৃঙ্গ জয়ের চেষ্টা করেন, তবে অনেকের জন্য সেটিই হয়ে ওঠে জীবনের শেষ অভিযান।

নির্মল পুরজা শুধু একজন পর্বতারোহী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাহস, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক সহনশীলতার প্রতীক। নিজের অর্জনের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভবকেও জয় করা যায়। কিন্তু যে মানুষটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলোকে একের পর এক জয় করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই পর্বতের বুকেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।

পর্বত জয় করা মানুষটি শেষ পর্যন্ত পর্বতের কাছেই হার মানলেন। তবে তার সাহস, অর্জন এবং অনুপ্রেরণার গল্প বিশ্বজুড়ে পর্বতারোহীদের হৃদয়ে বহু বছর ধরে বেঁচে থাকবে।