জুলাইয়ে সড়কে ঝরল ৪১৬ প্রাণ মোটরসাইকেলে সর্বাধিক

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

গত জুলাই মাসে দেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত এবং ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৩৮ জনই মোটরসাইকেল চালক বা আরোহী, যা মোট প্রাণহানির ৩৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। একই সময়ে ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। গত বুধবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত মাসিক সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই মাসে সংঘটিত ১৫৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৮ জন নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ মোট দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। এছাড়া দুর্ঘটনায় ৫১ জন যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন, যা মোট প্রাণহানির ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ। যানবাহনভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীর পর সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে থ্রি-হুইলারের যাত্রীদের। এ শ্রেণিতে নিহত হয়েছেন ৯৪ জন। এছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের ২৬ জন, বাসের ২১ জন, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের ১৯ জন, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের ৭ জন এবং রিকশা ও সাইকেলের ৫ জন আরোহী নিহত হয়েছেন। সড়কের ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে। মোট ১৬৯টি দুর্ঘটনা বা ৩৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক সড়কে ১৫৫টি, গ্রামীণ সড়কে ৬১টি, শহরের সড়কে ৬৬টি এবং অন্যান্য স্থানে ৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৬৪টি। এছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২৩টি, পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দিয়ে ১০৮টি, যানবাহনের পেছনে আঘাত করে ৫৪টি এবং অন্যান্য কারণে ৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৭১১টি। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ১৭২টি, থ্রি-হুইলার ১৩১টি, বাস ১২৪টি, ট্রাক ৯২টি এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৫২টি। এছাড়া কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্রলি, লরি, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, রিকশা, সাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনও দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।

সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সকালে সবচেয়ে বেশি ২৮ দশমিক ৮২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এরপর রাতে ১৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ, দুপুরে ১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ, বিকেলে ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১২ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ভোরে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৩৩টি দুর্ঘটনায় ১২৫ জন নিহত হয়েছেন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৯টি দুর্ঘটনায় ৮০ জন, রাজশাহী বিভাগে ৫২টি দুর্ঘটনায় ৫০ জন, রংপুর বিভাগে ৪৫টি দুর্ঘটনায় ৪৭ জন, খুলনা বিভাগে ৩৬টি দুর্ঘটনায় ৩২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৪টি দুর্ঘটনায় ৩০ জন, সিলেট বিভাগে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন এবং বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ২৮টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৩৪টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।ঈরঃু ্ খড়পধষ এঁরফবং

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৩ জন শিক্ষার্থী, ২৭ জন ব্যবসায়ী, ২৩ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ১৭ জন বিক্রয় প্রতিনিধি, ১৬ জন এনজিও কর্মী, ১৪ জন ব্যাংক ও বীমা খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ৭ জন শিক্ষক, ৩ জন সাংবাদিক, ৩ জন আইনজীবী, ৩ জন মসজিদের ইমাম বা খাদেম, ২ জন চিকিৎসক, ২ জন প্রকৌশলী, একজন পুলিশ সদস্য এবং একজন বিজিবি সদস্য রয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও বেতনের অভাব, মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে দায়ী করেছে।

এসব পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, দক্ষ চালক তৈরি, মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ, সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ এবং সমন্বিত যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনেরসহ ১২ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।