কাঁচা মরিচে স্বস্তি ফিরলেও ডিমে অস্বস্তি

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টির অজুহাতে রাজধানীর কাঁচাবাজারে অস্বাভাবিক দামে বিক্রি হচ্ছিল সবজি। ১০০ থেকে ১২০ টাকার নিচে কোনো সবজিই পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় বাজারে এখন সবজির দামে সামান্য স্বস্তি ফিরেছে। অধিকাংশ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হলেও কিছু সবজির দাম এখনও ১০০ টাকার ঘরে রয়েছে। অন্যদিকে মাছ, মুরগি, ডিম ও মাংসের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ অব্যাহত থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

সবজির বাজার : বাজারে গিয়ে দেখা যায়, গত কয়েক সপ্তাহে কাঁচা মরিচের কেজি ৪০০ টাকা ছুঁয়ে গেলেও বর্তমানে তা কমে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বরবটি প্রতি কেজি ৮০ টাকা, ঝিঙা ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, ধন্দুল ৬০ টাকা, শসা ৬০ টাকা, পটোল ৬০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৬০ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা এবং টমেটো ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া লাউ প্রতি পিস ৬০ থেকে ৮০ টাকা, মুলা ৮০ টাকা, জালি ৬০ টাকা, গোল বেগুন ১০০ টাকা, গাজর ১০০ টাকা, কচু ৮০ টাকা, করলা ১০০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৬০ টাকা এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

নারিন্দা কাঁচা বাজারের সবজি বিক্রেতা এনামুল হক বলেন, ‘বৃষ্টির সময় খেত থেকে ঠিকমতো সবজি উঠেনি, তাই বাজারেও সরবরাহ কম ছিল। সে কারণে দাম বেড়ে গিয়েছিল। এখন পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো, বাজারে সবজিও বেশি আসছে। তাই বেশিরভাগ সবজির দাম কমেছে। তবে কিছু সবজির মৌসুম না থাকায় সেগুলোর দাম এখনও একটু বেশি।’ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ধুপখোলা বাজারে কেনাকাটা করতে আসা সরকারি চাকরিজীবী বেলাল হোসাইন বলেন, ‘আজ বাজারে এসে দেখলাম আগের চেয়ে সবজির দাম কিছুটা কমেছে। এতে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সব ধরনের সবজি এখনও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসেনি। অনেক সবজির দাম কমলেও কিছু সবজি এখনও ১০০ টাকার কাছাকাছি বিক্রি হচ্ছে। বাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।’

ডিম ও মাংসের বাজার : সবজির বাজারে স্বস্তি ফিরলেও মাছ, মাংস, ডিম ও মুরগির বাজারে ভোগান্তি কমেনি। বর্তমানে ২০০ টাকার নিচে মিলছে না ব্রয়লার মুরগি ও অধিকাংশ মাছ। ডিমের দামও বেড়ে ডজনপ্রতি ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সরেজমিন দেখা যায়, গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ২০০ টাকায় উঠেছে। তবে সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা, হাইব্রিড ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা এবং লেয়ার মুরগি ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। রায় সাহেব বাজারের মুরগি বিক্রেতা মোখলেস মিয়া বলেন, ‘গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা বেড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় এ দাম বেড়েছে। তবে সোনালি মুরগির দামে তেমন কোনও পরিবর্তন হয়নি। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে ব্রয়লারের দামও আবার কমে আসবে বলে আশা করছি।’

মাছের বাজার : মাছের বাজারেও নেই স্বস্তি। মাছের বাজারেও সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। জীবিত পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০ টাকা, মাঝারি রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া চিংড়ি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, ট্যাংরা ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, পোয়া ৩৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। রূপচাঁদা, নদীর বেলে ও বড় আকারের কিছু সামুদ্রিক মাছ কিনতে হলে হাজার টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে।

রায় সাহেব বাজারের মাছ বিক্রেতা আব্দুল করিম বলেন, ‘পুকুরে চাষ করা মাছের দামও এখন আগের চেয়ে বেশি। আমরা আড়ত থেকে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছি, তাই বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। বিশেষ করে পাঙাশ, তেলাপিয়া ও রুই মাছের দাম কিছুটা বেড়েছে। সরবরাহ বাড়লে বাজারও স্বাভাবিক হবে।’

বাজারে কেনাকাটা করতে আসা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রয়লার মুরগি, পাঙাশ ও তেলাপিয়াই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ভরসা। এসব পণ্যের দাম বাড়লে সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’

সব মিলিয়ে রাজধানীর বাজারে সবজির দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও মাছ, মাংস, মুরগি ও ডিমের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ব্যয় কমার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাজারের চাপ এখনও বহাল রয়েছে।

৪০০-এর কাঁচা মরিচ নামল ৮০ টাকায় : সম্প্রতি দেশের খুচরা বাজারে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে বিক্রি হয়েছে কাঁচা মরিচ। এ পরিস্থিতিতে দেশের বাজার স্থিতিশীল করতে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে দেশে কাঁচা মরিচ আমদানি করা হয়েছে। আমদানির পর সেখানকার পায়কারি বাজারে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে মরিচ।

হিলি স্থলবন্দর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্দর দিয়ে গত ৩ আগস্ট প্রথম কাঁচা মরিচ আমদানি হয়। এ দিন বন্দর দিয়ে ৪টি ট্রাকে ২৯ টন ৪৪০ কেজি কাঁচা মরিচ আমদানি হয়। ৪ আগস্ট ১২টি ট্রাকে ৭৫ টন ৫২০ কেজি আমদানি হয়। এরপর গতকাল (৬ আগস্ট) ৮টি ট্রাকে ৬২ টন ৬৮০ কেজি কাঁচা মরিচ আমদানি হয়। প্রথমদিন বন্দরে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হলেও পরে দিন তা কমে ১৪০ টাকায় নেমে আসে। বর্তমানে তা আরও কমে ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

হিলি স্থলবন্দরে কাঁচা মরিচ কিনতে আসা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দেশীয় কাঁচা মরিচের সরবরাহ কম থাকায় দাম খানিকটা ঊর্ধ্বমুখী। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করার লক্ষ্যে হিলি স্থলবন্দরে এসেছি কাঁচা মরিচ কিনতে। তবে প্রথম দিকে আমদানি কম থাকায় বন্দর থেকে প্রতিকেজি ১৬০টাকা কেজি দরে কিনে মোকামে পাঠিয়েছিলাম। এখন আমদানি বাড়ায় দিন দিন দাম কমছে। গতকাল বন্দরে প্রতি কেজি নিম্ন মানের মরিচ ৮০ টাকা, ভালোগুলো ৯০ থেকে ১০০ টাকা বা কিছু ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এতে করে আমরা যারা পাইকার তাদের সুবিধা হয়েছে। আমরা কম দামে কিনতে পারছি। মোকামে পাঠাতে পারছি। তাই মানুষজনও আগের তুলনায় কম দামে খেতে পারছে।

হিলি স্থলবন্দরের কাঁচা মরিচ আমদানিকারক নাহিদ হোসেন বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাঁচা মরিচের খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে বাজারে চাহিদার তুলনায় পণ্যটির সরবরাহ কমায় দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছিল। দাম বাড়তে বাড়তে স্থানভেদে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় উঠে গিয়েছিল। সরকার আমদানির অনুমতি দেওয়ায় দেশের বাজারে কাঁচা মরিচের সরবরাহ এখন স্বাভাবিক।

হিলি স্থলবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশে কাঁচামরিচের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠলে গত রোববার সরকার পুনরায় ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি দেয়। সারাদেশের মতো হিলি স্থলবন্দরের বেশ কয়েকজন আমদানিকারক বিপুল পরিমাণ কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি পায়। ফলে দীর্ঘ সাড়ে ৮ মাস বন্ধের পর গত সোমবার থেকে আবারও হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানি শুরু হয়।

হিলি স্থলবন্দর দিয়ে সর্বশেষ গত বছরের ২০ নভেম্বর ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানি হয়েছিল।

ডজনে ১৫০ টাকা, ডিমও এখন বিলাসিতা : ডিমের ট্রের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দামাদামি করলেন রিকশাচালক মো. সাইফুল ইসলাম। এক ডজন ডিম হাতে নিয়ে আবার রেখে দিলেন। পরে বিক্রেতাকে বললেন, ‘এক হালি দেন। পুরো ডজন নেওয়ার মতো টাকা নেই।’ গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর মিরপুর ১০ এলাকার একটি দোকানে এমন দৃশ্য দেখা যায়। সাইফুলের ক্ষেত্রেই নয়, আরও অনেক ক্রেতার ক্ষেত্রে দেখা গেল। কেউ এক ডজনের বদলে ছয়টি, কেউ আবার চারটি ডিম কিনে বাজার শেষ করছেন। বিক্রেতারা বলছেন, ডিমের দাম বাড়ার পর থেকে পুরো ডজন কিনছেন এমন ক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে।