৩৫ বছর পর এমপিদের ভোটে ফিরছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

এরই মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কার নামে মনোয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়নি। এদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে এলডিপি প্রেসিডেন্ট অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেছে।
১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ওই বছর সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস। এরপর আর কোনো রাষ্ট্রপতি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করা লাগেনি। এবার ৩৫ বছর পর অবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণের প্রয়োজনীয় দেখা দিতে পারে। কারণ, ক্ষমতাসীন বিএনপির একসময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোট এখন প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায়। আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
জানা গেছে, বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কার নামে মনোয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়নি। এদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে এলডিপি প্রেসিডেন্ট অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেছে।
তবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সরাসরি ঘোষণাপত্র থেকে। পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী নানাভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কখনও জগণের ভোটে এবং কখনও সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।
বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন করা হয়েছিল সম্পূর্ণ এক ভিন্ন পরিস্থিতিতে। মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার ঐতিহাসিক ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ জারি করে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করে। তিনি তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি কোনো সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নন, বরং ঘোষণাপত্রের মাধ্যমেই নিযুক্ত হয়েছিলেন। ঘোষণাপত্রটি ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ করা হলেও এর কার্যকারিতা ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ধরা হয়।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ৫৫ বছরের ইতিহাস স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি বদলেছে বারবার। কখনও সরাসরি জনভোট এবং কখনও সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভেটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছে। আবার কখনও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং কয়েকজন রাষ্ট্রপতি হয়েছেন নির্বাচন ছাড়াই রাজনৈতিক ও সামরিক পালাবদলের মাধ্যমেও হয়েছেন। সরকারব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনেন। ১৯৭২ সালের অস্থায়ী সংবিধান আদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত কাঠামো থেকে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হয়। শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হন এবং ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই পর্যায়ে তাকে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচন করা হয়নি।
১৯৭২ সালের সংবিধান ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক পদ্ধতি হয় সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচন। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১০ এপ্রিল বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন।
আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে পদত্যাগ করলে তৎকালীন স্পিকার মোহাম্মদ মুহম্মদুল্লাহ প্রথমে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে তিনি পূর্ণ রাষ্ট্রপতি হন। বঙ্গভবনের সরকারি তালিকায় দেখা যায়, তার পূর্ণ রাষ্ট্রপতি মেয়াদের শুরু হয় ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি। এতে তিনিই একমাত্র প্রার্থী ছিলেন। সুতরাং কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।
১৯৭৫ : নির্বাচন ছাড়াই আবার রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়। একই সংশোধনের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। এর জন্য আলাদা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়নি। নতুন ব্যবস্থায় ভবিষ্যতের রাষ্ট্রপতির জন্য সরাসরি নির্বাচনের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলেও শেখ মুজিব রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমেই। বঙ্গভবনের সরকারি তালিকা অনুযায়ী তার দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি মেয়াদ ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫।
১৫ আগস্টের পর : অভ্যুত্থান ও সামরিক পালাবদল
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। এটি কোনো সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছিল না। এরপর ৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। পরে তিনি সংসদ ও মন্ত্রিসভা ভেঙে সামরিক আইন জারি করেন এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বও নেন। ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়লে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। তবে ১৯৭৮ সালে পরে সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
১৯৭৮ : বাংলাদেশের প্রথম সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
৩ জুন ১৯৭৮ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার সাধারণ ভোটাররা সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন। জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী। এটাই বাংলাদেশের প্রথম সরাসরি জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এরপর ১৫ নভেম্বর ১৯৮১ সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির প্রার্থী আবদুস সাত্তার নির্বাচিত হন। কিন্তু ২৪ মার্চ ১৯৮২ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাত্তার সরকার উৎখাত করেন।
ক্ষমতা দখলের পর এরশাদ সাথে সাথে নিজে রাষ্ট্রপতি হননি। ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে বসানো হয়। এটি কোনো নির্বাচন ছিল না; সামরিক শাসক এরশাদের সিদ্ধান্তে তিনি রাষ্ট্রপতি হন। ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সেটিও নির্বাচনের মাধ্যমে নয়।
এর প্রায় ৩ বছর পর, ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর তৃতীয় সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরশাদ জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। তবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ প্রধানবিরোধী শক্তিগুলো নির্বাচন বর্জন করেছিল। ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত এবং ভোটগ্রহণ হলেও এর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তখন থেকেই বড় প্রশ্ন ছিল। এটাই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের শেষ সরাসরি জনভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মুখে ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করেন। রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ প্রথমে উপরাষ্ট্রপতি এবং এরশাদের পদত্যাগের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার অধীনে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরে একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিশেষ সাংবিধানিক ব্যবস্থার বৈধতা দেওয়া হয়।
১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়। রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে যায় এবং তাকে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচনের ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। বর্তমানে সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদেও স্পষ্টভাবে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দ্বারা আইন অনুযায়ী নির্বাচিত হবেন। ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদ সদস্যদের ভোটে আওয়ামী লীগ মনোনীতি সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করে বিএনপি মনোনীত আবদুর রহমান বিশ্বাস জয়ী হন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। এরপর থেকে আর কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করে। ২০০২ সালে তার পদত্যাগের পর স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে একই বছরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদের পাশাপাশি আরও দুজন মনোনয়ন জমা দিলেও তাদের মনোনয়ন বৈধ হয়নি। ফলে ইয়াজউদ্দিন একমাত্র বৈধ প্রার্থী হয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
এরপর ২০০৯ সালে জিল্লুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করে আওয়ামী লীগ। অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় নির্বাচন কমিশন ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করে। পরদিন তিনি শপথ নেন।
জিল্লুর রহমান অসুস্থ হওয়ার পর স্পিকার আবদুল হামিদ প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০ মার্চ ২০১৩ জিল্লুর রহমানের মৃত্যু হলে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আবদুল হামিদই একমাত্র প্রার্থী ছিলেন।
ফলে ২২ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করে এবং ২৪ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর ২০১৮ সালে আবদুল হামিদের দ্বিতীয় মেয়াদে বিনা প্রদ্বিন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হন।
২০২৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মো. সাহাবুদ্দিনকে প্রার্থী করে। অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় নির্বাচন কমিশন তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে। তিনি ২৪ এপ্রিল ২০২৩ দায়িত্ব নেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
পরে ২০২৬ সালে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে ২৪ জুলাই পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
