সুসংবাদ প্রতিদিন
রঙিন মাছেই লাখপতি পটুয়াখালীর ইমন
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
পটুয়াখালী প্রতিনিধি

শখের বশে শুরু করেছিলেন রঙিন মাছ চাষ। প্রথম দিকে একের পর এক মাছ মারা গেলেও হাল ছাড়েননি পটুয়াখালী শহরের তরুণ উদ্যোক্তা মেহেরাব ইমন। অনলাইন থেকে জ্ঞান নিয়ে নিজেই করেছেন নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সেই শখই এখন পরিণত হয়েছে সফল ব্যবসায়। বাড়ির আঙিনায় গড়ে তোলা খামারে রয়েছে হাজারো রঙিন মাছ। মাসে আয় করছেন লাখ টাকারও বেশি। ইমনের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন স্থানীয় অনেক তরুণ।
পটুয়াখালী পৌর শহরের কলাতলা এলাকায় বাড়ির আঙিনায় গড়ে উঠেছে রঙিন মাছের এই ব্যতিক্রমী খামার। সারি সারি প্লাস্টিকের বোতল ও জারে খেলা করছে নানা রঙের বেটা, মলি, গাপ্পি, সোর্ডটেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। লাল, নীল, হলুদসহ নানা রঙের মাছের সমারোহে পুরো খামারজুড়েই যেন উৎসবের আমেজ। এই রঙিন জগতের কারিগর তরুণ উদ্যোক্তা মেহেরাব ইমন। ২০২১ সালে পড়াশোনা শেষ করে শখের বশে বেটা মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। পরের বছর পটুয়াখালী শহরের বটতলা মসজিদ এলাকায় পৈতৃক জমিতে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলেন মাছের খামার।
ঢাকায় বোনের বাসায় গিয়ে বিভিন্ন রঙের বেটা মাছ দেখে আগ্রহ তৈরি হয় ইমনের। পরে বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে প্রথম পাঁচ জোড়া মাছ কিনে চাষ শুরু করেন। তবে শুরুতেই বড় ধাক্কা খান তিনি। পরিচর্যার অভিজ্ঞতা না থাকায় মারা যায় প্রায় সব মাছ। কিন্তু ব্যর্থতায় দমে যাননি। অনলাইন থেকে বিভিন্ন তথ্য ও কৌশল শিখে নিজেই শুরু করেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
মেহেরাব ইমন বলেন, শুরুতে আসলে মাছ চাষ সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। শখ থেকেই পাঁচ জোড়া মাছ কিনে কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু প্রথম দিকে অনেক মাছ মারা যায়। তখন বুঝতে পারি, শুধু মাছ কিনে রাখলেই হবে না- পানি, খাবার, তাপমাত্রা ও প্রজননসহ প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে। এরপর অনলাইনে বিভিন্ন ভিডিও ও তথ্য দেখে শিখতে শুরু করি। নিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। ধীরে ধীরে মাছ মারা যাওয়ার হার কমে আসে এবং উৎপাদন বাড়তে থাকে। বর্তমানে ইমনের খামারে বোতল ও জারে রয়েছে হাজারো রঙিন মাছ। ফাইটার, মুন টেইল মলি, রোজ টেইল, ফেদার টেইল, গোল্ডফিশ ও হাফ মুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করছেন তিনি। ডিম থেকে মাছ বড় হয়ে বিক্রির উপযোগী হতে সময় লাগে প্রায় চার মাস। প্রজাতি ও মানভেদে এক জোড়া মাছ ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন ইমন। পাইকারিতে ১০০ মাছ বিক্রি হয় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকায়।
ইমন জানান, খামারে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের উন্নতমানের রঙিন মাছ উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। মাছের খাবারের পেছনে মাসে খরচ হয় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। খামারে ব্যবহৃত মাছের খাবারের বড় একটি অংশও নিজেই উৎপাদন করেন তিনি। মেহেরাব ইমন বলেন, রঙিন মাছের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নিয়মিত পরিচর্যা। পানির মান ঠিক রাখতে হয়, সময়মতো খাবার দিতে হয় এবং প্রজননের সময় আলাদা ব্যবস্থা করতে হয়। এসব বিষয়ে এখন অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। নিজেরাই মাছের খাবারের একটি বড় অংশ তৈরি করি। এতে খরচও কমে এবং মাছের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার নিশ্চিত করা যায়। ইমনের খামারের মাছ এখন শুধু পটুয়াখালীতে সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইনে দেশের বিভিন্ন জেলার ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন তিনি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বাগেরহাট, বগুড়া ও রাজশাহীর ক্রেতারা নিয়মিত মাছ কিনছেন। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে জীবন্ত রঙিন মাছ। অনলাইনে বিক্রির কারণে পটুয়াখালীতে বসেই দেশের বড় বাজারে পৌঁছাতে পারছেন ইমন।
ইমন বলেন, অনলাইন আসার কারণে ব্যবসাটা অনেক সহজ হয়েছে। আগে শুধু স্থানীয়ভাবে মাছ বিক্রি করার সুযোগ ছিল। এখন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার আসে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার ক্রেতারা অনলাইনে মাছ পছন্দ করে অর্ডার করেন। পরে কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিই। তবে জীবন্ত মাছ পাঠাতে হলে প্যাকেজিং ও পরিবহনের বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। ইমনের খামারে রঙিন মাছ কিনতে আসছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে এসব মাছের প্রতি রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। ১২ বছর বয়সী হাসানও ইমনের খামারের একজন ক্রেতা।
হাসান বলে, রঙিন মাছ আমার খুব ভালো লাগে। এখানে অনেক ধরনের ও অনেক রঙের মাছ আছে। দেখতে খুব সুন্দর। তাই মাছ কিনতে এখানে এসেছি। শুরুতে বাবা-মা সাপোর্ট করেনি। পরে যখন দেখেছে আমি মোবাইল রেখে মাছ নিয়ে পড়ে আছি, তখন থেকেই আমার রঙিন মাছ পালনের বিষয়টিকে তারা সমর্থন করতে শুরু করেছে।
স্থানীয় ক্রেতা আসাদুজ্জামান মিলন বলেন, আগে রঙিন মাছ কিনতে হলে পটুয়াখালীর বাইরে থেকে আনতে হতো। এখন শহরের মধ্যেই বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যাচ্ছে। ইমনের উদ্যোগটা ভালো লেগেছে। মাছগুলোর মানও ভালো এবং অনেক ধরনের মাছ এখানে পাওয়া যায়। আমি ইমনকে দেখে এই রঙিন মাছ পালন শুরু করেছি।
ইমনের প্রতিবেশী মনির গাজী বলেন, রঙিন মাছ এখন অনেকেরই শখের বিষয় হয়ে উঠেছে। ইমনের খামারে বিভিন্ন জাতের মাছ পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়লে মানুষের চাহিদা সহজেই পূরণ হবে। এভাবে রঙিন মাছ পালনের মাধ্যমে সমাজের বেকারত্ব সমস্যারও অনেকটা সমাধান হতে পারে। ইমনের বাবা মোফাজ্জল হোসেন ছেলের উদ্যোগের শুরুটা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে প্রথম পাঁচ জোড়া মাছ কেনার পর শুরুতে প্রায় সব মাছ মারা যায়। কিন্তু তাতেও হাল ছাড়েননি ইমন।
মোফাজ্জল হোসেন বলেন, প্রথম দিকে প্রায় সব মাছ মারা যাওয়ায় আমরা চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু ইমন হাল ছাড়েনি। বারবার চেষ্টা করেছে, নতুন করে শিখেছে। এখন সে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। আমি এবং ইমনের মাও বর্তমানে এই রঙিন মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছি। বর্তমানে এখান থেকে যা আয় হয়, তাতে আমাদের সংসার ভালোভাবেই চলছে।
ইমনের সাফল্য এখন স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। চাকরির পেছনে না ছুটে অল্প জায়গা ও তুলনামূলক কম বিনিয়োগে রঙিন মাছ চাষ করে আয় করার সম্ভাবনা দেখছেন অনেকেই। স্থানীয় তরুণদের অনেকেই মনে করছেন, রঙিন মাছ চাষকে শুধু শখ হিসেবে না দেখে বাণিজ্যিকভাবে নেওয়া গেলে এটি হতে পারে আত্মকর্মসংস্থানের একটি ভালো মাধ্যম।
