গ্রামের ভোগান্তি এবার রাজধানীতে

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

গ্রামাঞ্চলে দিনে আট থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগের মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেও রোস্টার বা পালা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে। কোথাও ২০ মিনিট, কোথাও বা ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকার কথা বলছেন নগরবাসী।

মধ্যরাতে লোডশেডিংয়ের কারণে তীব্র গরমে ভোগান্তির কথা উঠে আসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

গত বুধবার রাতে মিরপুর, শেরেবাংলা নগর ও ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কথা বলেছেন বাসিন্দারা।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির পূর্বাভাসে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পিকে ঢাকা এলাকায় ৪৬৫ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে সম্ভাব্য লোডশেডিং ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৪৫ মেগাওয়াট।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, রাত ৯টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার ৬৬০ মেগাওয়াটে উঠতে পারে। ওই সময়ে উৎপাদনের পূর্বাভাস রয়েছে ১৬ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

পূর্বাভাসে ঢাকার পর ময়মনসিংহে ৩৫০ মেগাওয়াট, খুলনায় ৩২০ মেগাওয়াট এবং কুমিল্লা ও রাজশাহীতে ৩০০ মেগাওয়াট করে লোডশেডিংয়ের কথা বলা হয়েছে।

লোডশেডিংয়ের এই হিসাব সময়ের নয়, বিদ্যুতের পরিমাণের। বিতরণ কোম্পানিগুলো ফিডারভিত্তিক পালাক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রেখে ঘাটতি সামলায়। ফলে ঢাকার সব এলাকায় একই সময় বা সমান সময় বিদ্যুৎ থাকবে না।

জাতীয় পর্যায়ে ঘাটতির চাপের মধ্যেই বুধবার রাতে ঢাকার কয়েকটি এলাকায় রোস্টার করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিপিডিসির কর্মকর্তারা।

ধানমন্ডি এলাকার ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. গোলাম মোরশেদ বলেন, বুধবার রাতে তার এলাকার চাহিদা ছিল ৪৩ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ ৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেছে। ‘স্থানীয় বিতরণ লাইনে কোনো সমস্যা ছিল না। জাতীয় পর্যায়ে কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় রোস্টার করে সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে।’

ডিপিডিসির দক্ষিণাঞ্চলীয় নেটওয়ার্ক অপারেশন অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. কামাল হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জ এলাকায় চাহিদা ছিল ৩৮১ মেগাওয়াট। সেখানে প্রায় ৬০ মেগাওয়াটের ঘাটতি ছিল।

গ্যাস সংকটকে বিদ্যুৎ কম পাওয়ার প্রধান কারণ বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করে বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঢাকায় লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকার বাইরে অন্য বিতরণ সংস্থা ও পল্লী বিদ্যুতের বরাদ্দ বাড়ানোর সিদ্ধান্তও হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের সংকট আরও গভীর বলে দাবি করছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এসোসিয়েশন। সংগঠনটির হিসাবে, তাদের এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। এই ঘাটতিতে অনেক এলাকায় দিনে ৮, ১০ বা ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে সংগঠনটির দাবি।

দেশে প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি পল্লী বিদ্যুতের আওতায় বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। গ্রাহকের ক্ষোভ থেকে উপকেন্দ্র, গ্রিড ও কার্যালয়ে হামলার আশঙ্কা জানিয়ে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জন্য পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে সংগঠনটি।

পিজিসিবির ঘণ্টাভিত্তিক প্রকৃত হিসাব বলছে, বৃহস্পতিবার ভোরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ছিল। রাত ২টায় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬৭ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৬৩০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট। ভোর ৩টায়ও লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৪৯৮ মেগাওয়াট। ভোর ৪টায় তা ২ হাজার ২৫ মেগাওয়াটে নামে।

সকাল বাড়ার সঙ্গে ঘাটতি কমতে থাকে। সকাল ৮টায় লোডশেডিং ছিল ৭০৯ মেগাওয়াট। সকাল ৯টায় তা কমে ৫২৫ মেগাওয়াট হয়। সকাল ১০টায় লোডশেডিং ছিল ৪৭১ মেগাওয়াট।

পিজিসিবির সারণিতে ‘ডে পিক’ হিসেবে দেখানো দুপুর ১২টায় চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮৮৭ মেগাওয়াট। ওই সময়ে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৪৭৭ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ৪১০ মেগাওয়াট। বিকাল ৪টায় লোডশেডিং সর্বনিম্ন ১৯৫ মেগাওয়াটে নামে।

সন্ধ্যা ৬টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৪৩ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ৩৭৬ মেগাওয়াট। দিনে লোডশেডিং কমলেও সেটি সরবরাহে বড় উন্নতির স্পষ্ট প্রমাণ নয়। বিকাল ৩টায় পূর্বাভাসে চাহিদা ধরা হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। ওই সময়ে ৩ হাজার ৫৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হতে পারে বলেও ধরা হয়েছিল। বাস্তবে বিকাল ৩টায় চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮৩৮ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৪৬১ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ৩৭৭ মেগাওয়াট।

অর্থাৎ পূর্বাভাসের চেয়ে চাহিদা কম ছিল প্রায় ২ হাজার ৯৬২ মেগাওয়াট। সরবরাহের পার্থক্য ছিল মাত্র ১৩৯ মেগাওয়াট। এই হিসাব বলছে, বিকালে লোডশেডিং কমার পেছনে সরবরাহ বাড়ার চেয়ে চাহিদা কমে যাওয়ার ভূমিকা বেশি।

গত বুধবার বিকাল ৩টায় চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট, সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট। পরদিন একই সময়ে সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ৬০৬ মেগাওয়াট। চাহিদা কমেছে প্রায় ২ হাজার ৩৯৯ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং কমেছে ৩ হাজার ৫ মেগাওয়াট।

পেট্রোবাংলার ১১ অগাস্ট সকাল ৮টা থেকে ১২ অগাস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত দৈনিক হিসাবের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ১০৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশিয় গ্যাস ছিল ১ হাজার ৬৪১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট। আমদানি করা এলএনজি ছিল ৪৬৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট।

আগের ২৪ ঘণ্টায় এলএনজি সরবরাহ ছিল ৫৬৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ একদিনে এলএনজি সরবরাহ কমেছে প্রায় ৯ কোটি ৫৬ লাখ ঘনফুট। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ছিল ২ হাজার ৫২৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে তারা গ্যাস পেয়েছে ৭৮৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৩১ শতাংশ গ্যাস পেয়েছে বিদ্যুৎ খাত।

ঘোড়াশালের ১ হাজার ৩১৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র, ৫৮৩ মেগাওয়াটের সামিট মেঘনাঘাট-২ কেন্দ্র, ৫৮৪ মেগাওয়াটের ইউনিক মেঘনাঘাট কেন্দ্র এবং ২১০ মেগাওয়াটের আরপিসিএল কেন্দ্র গ্যাস পায়নি বলে পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। ৭১৮ মেগাওয়াটের জেরা মেঘনাঘাট কেন্দ্রের চাহিদা ছিল ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট, কেন্দ্রটি পেয়েছে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

পিজিসিবির ১৩ অগাস্টের কেন্দ্রভিত্তিক তালিকায় ২২টি ইউনিটের পাশে গ্যাস সংকটের কথা লেখা আছে। ওই তালিকায় ১২ অগাস্টের সন্ধ্যার পিকের প্রকৃত উৎপাদনের হিসাবও রয়েছে। তাতে দেখা যায়, গ্যাস সংকট লেখা ১২টি ইউনিট সন্ধ্যার পিকে একেবারেই উৎপাদনে ছিল না। ইউনিটগুলোর বর্তমান সক্ষমতা যোগ করলে তা প্রায় ৩ হাজার ৭১২ মেগাওয়াট।

তালিকায় ঘোড়াশাল, মেঘনাঘাট, সিদ্ধিরগঞ্জ, আশুগঞ্জ, ভেড়ামারা ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন কেন্দ্র রয়েছে। তবে গ্যাস সংকটই একমাত্র সমস্যা নয়। তালিকায় তরল জ্বালানির ঘাটতি, যন্ত্রের ত্রুটি, মেরামত এবং কয়লা সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার কথাও আছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালন বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, উত্তাল সমুদ্রের কারণে এলএনজির কার্গো ভেড়ানো যাচ্ছে না। একটি সচল ইউনিট থেকে এখন প্রায় ৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাস আসছে। কার্গো ভেড়ানো গেলে সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন তারা।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, গ্যাস বা ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমানোর নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্য খাত থেকে গ্যাস কমিয়ে পিডিবিকে দৈনিক ১ হাজার এমএমসিএফডি গ্যাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে তথ্য দেন এ কর্মকর্তা। তার কথায়, জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্রগুলোও সর্বোচ্চ চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ইঞ্জিনচালিত এসব কেন্দ্র একটানা ২৪ ঘণ্টা একইভাবে চালানো যায় না। শীতল করার ব্যবস্থা সচল রাখতে সেগুলো মাঝে মধ্যে বন্ধ রাখতে হয়।