আলোচিত ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের উদ্যোগ

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে ঐতিহাসিক এই ভোটের ফলাফলের পাশাপাশি নতুন করে সামনে এসেছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। যে অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতাকে সীমিত করে, নির্বাচন শেষ হওয়ার দিনই সেটি সংশোধনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচনি কর্তা এএমএম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন।

এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার বিধান রয়েছে। আইনের ১০ ধারায় প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোট এবং ব্যালটে স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর সে বছরের অক্টোবরে সর্বশেষ একাধিক প্রার্থীর মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল। তখন বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করেন। এরপরের প্রায় সব রাষ্ট্রপতি নির্বাচনই কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্পন্ন হয়েছে। ফলে মির্জা ফখরুল ও অলি আহমদের এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে ব্যতিক্রমী। কিন্তু নির্বাচনকে ঘিরে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল, সংসদ সদস্যরা আদৌ নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন কি না।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছিলেন, এই নির্বাচনেও ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারাতে হবে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সরাসরি ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন’ শব্দটি নেই। ১৯৯১ সালে এক সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোটকেও ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় আনার বিধান করা হয়েছিল, পরে সেটি প্রত্যাহার করা হয়। ফলে আইনজ্ঞদের একাংশের মতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য কি না, তা নিয়ে ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে। অন্য অংশের যুক্তি, ভোট যেহেতু সংসদ সদস্যদের এবং সংসদের ভেতরে অনুষ্ঠিত হয়, তাই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এখানেও প্রযোজ্য। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে অলি আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, কোনো সংসদ সদস্য তার ইচ্ছা অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন না, এখানে গণতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত। কর্তার ইচ্ছাই কর্ম হবে, দলের পক্ষ থেকে যেখানে ভোট দিতে বলা হবে, সেখানেই ভোট দিতে হবে।

তিনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেউ দলের মতামতের বাইরে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্যপদ থাকবে না। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের ৩১ দফা অনুযায়ী সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ তুলে দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু তারা কেন তড়িঘড়ি করে নির্বাচন আয়োজন করেছে, তা জানা নেই। তারা হয়তো মনে করছে সংশোধন না করে নির্বাচন করলে তাদের প্রার্থী জয়লাভ করবে আর সংশোধন হয়ে গেলে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। আর এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই নির্বাচনের দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সরকার ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে এবং পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংশোধিত বিধানের অধীনেই হবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় আস্থা ভোট ও অর্থবিল ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারবেন।

এই প্রস্তাব নতুন নয়। জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায়ও আস্থা ভোট ও অর্থবিল ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। সেই সংস্কার কার্যকর হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর ফল নির্ধারণের একমাত্র নিয়ামক নাও থাকতে পারে। কোনো প্রার্থী নিজ দলের বাইরে থেকেও সংসদ সদস্যদের সমর্থন পাওয়ার বাস্তব সুযোগ পাবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তখন শুধু দুই প্রার্থীর নাম ব্যালটে থাকার প্রতিযোগিতা নয়, সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

তবে সরকারের ঘোষণাই সংবিধান সংশোধন নয়। সংশোধনের সুনির্দিষ্ট ভাষা কী হবে, কী প্রক্রিয়ায় তা অনুমোদিত হবে এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে স্বাধীন ভোটের বিষয়টি কতটা স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, সেসব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত সংসদীয় কমিটিতেও বিরোধী দল এখনও অংশ নেয়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ফলে গতকাল বৃহস্পতিবারের নির্বাচন দুই ধরনের বার্তা রেখে গেল। একদিকে, ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে আবার দৃশ্যমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফিরেছে এবং সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে বঙ্গভবনে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

অন্যদিকে, এই নির্বাচনই দেখিয়ে দিয়েছে শুধু একাধিক প্রার্থী থাকলেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণাঙ্গ হয় না। সংসদ সদস্যদের ভোট যদি আগেই দলীয় সিদ্ধান্তে বাঁধা থাকে, তবে ব্যালট থাকে, প্রতিদ্বন্দ্বীও থাকে, কিন্তু ফলের অনিশ্চয়তা অনেকটাই হারিয়ে যায়। ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন তাই শুধু সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হবে কি না, সেটিরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।