৬ মাসে ৪৬৪ অপতথ্যের শিকার বিএনপি সরকার

মন্ত্রী-উপদেষ্টা ও বিএনপি নেতাদের ঘিরে ২৬২ অপতথ্য, ৯৯ শতাংশই নেতিবাচক

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বিএনপি। সরকারের প্রথম ১৮০ দিন বা ৬ মাস ঘিরে যেমন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা কার্যক্রম আলোচনায় এসেছে, তেমনি এই সময়জুড়ে অনলাইন তথ্যপরিসরেও সক্রিয় ছিল নানা ধরনের অপতথ্য। সরকারের কর্মকাণ্ড, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ঘিরে ছড়িয়েছে বিভ্রান্তিকর দাবি। এছাড়াও বিকৃত তথ্য, পুরোনো ছবি-ভিডিওর নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্ট। অনলাইন ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম ১৮০ দিনে অর্থাৎ প্রথম ৬ মাসে সরকারকে নিয়ে ৪৬৪ অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। যার ৯১ শতাংশই নেতিবাচক প্রচারণা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিএনপি সরকার শপথ নেওয়ার পরদিন অর্থাৎ ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গত ১৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রথম ১৮০ দিনে সরকারকে জড়িয়ে দেশের তথ্যপরিসরে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অপতথ্যের বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। এ সময়ে সরকার ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিষয়কে কেন্দ্র করে মোট ৪৬৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশ অপতথ্যই ছিল সরকারের বিপক্ষে বা নেতিবাচক বার্তা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রচারিত। এসব অপতথ্যের সিংহভাগেই সরকার, এর নেতৃত্ব ও সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকারের অধীনে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি। এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরে বাংলাদেশ। ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় নতুন সরকার।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে গুজব ও অপতথ্যের প্রচার যেন নিত্যসঙ্গী। বিশেষ করে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঘিরে অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ে। বিএনপি সরকারের বেলায় শুরু থেকেই একই প্রবণতা লক্ষ্য করেছে রিউমর স্ক্যানার। সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে পরবর্তী মাসগুলোতে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে অপতথ্য হয়ে উঠেছিল যেন নীরব সঙ্গী। এআই-নির্ভর কনটেন্ট, সার্কাজম পেজের বিস্তারসহ অপতথ্য ছড়ানোর নানা কৌশল এর মাত্রা আরও বাড়িয়েছে। পরিসংখ্যানেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সরকারে থাকা সংশ্লিষ্টদের ঘিরে ছড়ানো অপতথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। কোনো ইস্যু নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে সার্কাজম পেজ হিসেবে পরিচিত কিছু পেজ থেকে ভুয়া মন্তব্য বা বক্তব্য তৈরি করা হয়। পরে এসব কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হয় অসংখ্য ফেসবুক গ্রুপ ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে। কখনও কখনও যাচাই না করেই এসব বক্তব্য দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা গণমাধ্যমের আলোচনাতেও উঠে আসে।

একই সময়ে এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ইস্যুভিত্তিক বিভ্রান্তিকর প্রচারণাও দেখা গেছে। এর সঙ্গে পুরোনো ভিডিও, ভুয়া ফটোকার্ড এবং প্রমাণহীন তথ্য যুক্ত হয়ে অনেক ক্ষেত্রে অপতথ্য প্রচারের সমন্বিত ক্যাম্পেইনের রূপ নিয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গত ছয় মাসে এমন অন্তত ১০টি ইস্যুতে অপতথ্যের ক্যাম্পেইন শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে কয়েকটি ক্যাম্পেইনের পেছনে থাকা মূল হোতাদেরও শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে রিউমর স্ক্যানার।

মন্ত্রী-উপদেষ্টা ও বিএনপি নেতাদের ঘিরে ২৬২ অপতথ্য, ৯৯ শতাংশই নেতিবাচক : বিএনপি সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সহকারী এবং সংসদ সদস্যদের ঘিরে গত ছয় মাসে অন্তত ২৬২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ অপতথ্যই ছিল নেতিবাচক। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত এসব অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে অনলাইন তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার। রিউমার স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাকে ঘিরে শনাক্ত ৪৮টি অপতথ্যের সবগুলোই ছিল নেতিবাচক। এরপর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে ঘিরে ৩৩টি এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকারী ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরে ২৬টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া সংসদে স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ঘিরে ২৩টি, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীকে ঘিরে ১৬টি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ঘিরে ১৫টি, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসকে ঘিরে ১৪টি এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে ঘিরে ১৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরকে ঘিরে ১১টি, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ঘিরে ৮টি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে ঘিরে ৭টি অপতথ্য পাওয়া গেছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে ঘিরে ৬টি, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে ঘিরে ৫টি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ঘিরে ৪টি এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকিকে ঘিরে ৩টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।

জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (যুব কর্মসংস্থানবিষয়ক) সাইয়েদ বিন আব্দুল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) রাশেদ খান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে ঘিরে দুটি করে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকারী জহির উদ্দীন স্বপন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিনকে ঘিরে একটি করে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।

সরকারে থাকা বিএনপির নারী নেত্রীদের ঘিরেও গত ছয় মাসে অপতথ্যের প্রবাহ দেখা গেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদকে ঘিরে চারটি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকারী আফরোজা খানম রিতাকে ঘিরে একটি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। তাদের ঘিরে শনাক্ত সব অপতথ্যই ছিল নেতিবাচক। সরকারের ১৮০ দিনে বিএনপির সংসদ সদস্যদের ঘিরেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের লক্ষ্য ছিলেন সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান। তাকে ঘিরে ১৬টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া লুৎফুজ্জামান বাবরকে ঘিরে ৫টি, মানসুরা আলমকে ঘিরে ৩টি এবং বরকত উল্লাহ বুলু, মনিরুল হক চৌধুরী, শাহাদাত হোসেন সেলিম ও নিলোফার চৌধুরী মনিকে ঘিরে দুটি করে অপতথ্য পাওয়া গেছে।