রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সমাবেশ
গণহত্যার বিচার ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রত্যাশা
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
কক্সবাজার অফিস

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে জান্তা সেনাবাহিনীর চালানো গণহত্যার বিচার এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবিতে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মিছিল ও সমাবেশ করেছেন বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা। একইসঙ্গে তারা বিশ্ববাসির কাছে মাত্র ১০ মিনিট সময় চেয়েছেন। তারা মনে করছেন, বিশ্ববাসি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ১০ মিনিট মনযোগ দিলেই সমাধানের পথ বের হয়ে আসবে।
গতকাল মঙ্গলবার উখিয়ার ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
রোহিঙ্গাদের সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর) এই সমাবেশের আয়োজন করে। এতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অংশ নেন। সমাবেশ শুরু হওয়ার আগে ভোর থেকেই বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে মানুষ সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন। ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে অংশগ্রহণকারীরা ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত সহিংসতায় নিহত ও বাস্তুচ্যুত স্বজনদের স্মরণ করেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা, নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুতির বিচার এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ ভাবে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার দাবি তুলেছেন। বক্তারা বলেন, মিয়ানমারে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। এ জন্য আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন তারা।
তাদের ভাষায়, রোহিঙ্গা সংকটের জন্ম মিয়ানমারে। তাই এ সংকটের চূড়ান্ত ও স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারেই নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করা হলেও প্রত্যাবাসনের কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশাও প্রকাশ করেন তারা। ইউসিআর এর প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য ও রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ২০১৭ সালের গণহত্যার ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা এখনও ন্যায়বিচার পাইনি। আমরা আমাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যেতে চাই। এই রোহিঙ্গা নেতা বলেন, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে কোনো প্রত্যাবাসন আমরা চাই না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের আহ্বান- রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিন এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করুন। সমাবেশে রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী মোহাম্মদ রফিক বলেন, আমরা বিশ্বের কাছে মাত্র ১০ মিনিট সময় চাই, অথচ আমরা ৯টি বছর পার করে দিয়েছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আমাদের দেশ নয়, আমরা আমাদের নিজ দেশে ফিরতে চাই। এজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ‘আরাকান আমাদের’ এর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু নেই। মানবিক বিশ্বকে এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বয়োবৃদ্ধ রোহিঙ্গা আব্দুল হাকিম অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, দেখতে দেখতে ৯ বছর চলে গেল। কিন্তু নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষা শেষ হয়নি। আমরা জানি না, কবে আবার মিয়ানমারের রাখাইনে নিজের ভিটেমাটিতে ফিরতে পারব। এই সমাবেশে বার্মিজ ভাষায় বক্তব্য দেন ইউসিআর নেতা মাস্টার মোহাম্মদ সোয়াইব। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর ভাবে কাজ করতে হবে, যাতে আমরা ভয় বা অনিশ্চয়তা ছাড়াই নিজ দেশে ফিরতে পারি। তার ভাষায়, ৯ বছরেও প্রত্যাবাসনের কোনো অগ্রগতি হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকট ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও সময়সীমাবদ্ধ প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা নেতা খিন মং বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি ত্রাণনির্ভর সংকটে পরিণত করা কোনো সমাধান নয়। আমরা সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শরণার্থী হিসেবে থাকতে চাই না। ইউসিআর এর নারী নেত্রী সাজিদা বেগম মনে করেন, গণহত্যা ও নিপীড়নের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব নারী ও শিশুদের ওপর পড়েছে। অসংখ্য মানুষ স্বজন ও ঘরবাড়ি হারিয়েছেন।
তিনি বলেন, আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ চাই, যেখানে আমাদের সন্তানদের আর পালিয়ে বেড়াতে হবে না। রোহিঙ্গা শিবিরে দায়িত্বরত ৮ এপিবিএন অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সমাবেশকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এপিবিএনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সমাবেশের একপর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা ১০ মিনিট ধরে রোহিঙ্গা ভাষায় বিভিন্ন স্লোগান দেন। স্লোগানের মাধ্যমে তারা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। সমাবেশ শেষে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশেষ মোনাজাত করেন মৌলভী আব্দুর রহিম। এতে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের শিকার মানুষের মাগফিরাত কামনা, গণহত্যার ন্যায়বিচার এবং নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পথ সুগম হওয়ার জন্য মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করা হয়। এদিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয় বলছে, প্রতিবছরের মতো এবারও রোহিঙ্গাদের সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এপিবিএন সদস্যরা তৎপর রয়েছেন।
এই সমাবেশ থেকে রোহিঙ্গারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, শুধু ত্রাণ দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক সংহতি ও কার্যকর কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
