স্মাইল ফর অল

সবুজায়ন ও নারীদের স্বাবলম্বী করার ভিন্ন উদ্যোগ

শুক্রবারের বিশেষ খবর

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  গাজী মুনছুর আজিজ

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় সবুজায়নের জন্য ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন ‘স্মাইল ফর অল’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনটি যাত্রা শুরু করে ২০১৫ সালে। তবে তারা সবুজায়ণের কার্যক্রম শুরু করেন ২০১৭ সাল থেকে। শুরু থেকেই তারা গাছ লাগানোসহ নানা সামাজিক কাজ করে আসছে। তাদের এ কার্যক্রমে ২০২৩ সাল থেকে উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন ডা. এ এস এম মুসা কবির। তার সহযোগিতায় সংগঠনটি তাদের কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করে। শুধু গাছ লাগানো কিংবা চারা বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ করছেন না তারা; নিয়মিত প্রতিটি গাছের খোঁজখবর নেওয়া, পরিচর্যা এবং কোনো গাছ নষ্ট হয়ে গেলে সেখানে নতুন চারা লাগানোর কাজও করছেন। সংগঠনের সভাপতি আকাশ বিশ্বাস বলেন, প্রতিটি গাছ রোপণের পর আমরা নিয়মিত তদারক করে থাকি- খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পাইপ ও পলিথিন পেঁচিয়ে দেওয়া হয়, যাতে গবাদিপশু ক্ষতি করতে না পারে। এরপর কীটনাশক স্প্রে করা হয়। গরমের সময় পানিও দেওয়া হয়। ডা. এ এস এম মুসা কবির বলেন, গাছ বাড়লে পরিবেশ ভালো থাকবে। পরিবেশ ভালো থাকলে মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। ফলের গাছ বাড়লে মানুষের পুষ্টির চাহিদাও মিটবে।

সংগঠনটির উদ্যোগে গাছের চারা বিতরণের আগে দেওয়া হয় প্রশিক্ষণ। চারা কীভাবে লাগাতে হবে, কীভাবে সার ও মাটি প্রয়োগ করতে হবে এবং গাছের নিয়মিত যত্ন কীভাবে নিতে হবে- এসব বিষয় হাতে-কলমে শেখানো হয়। এরপর চারা রোপণ ও বিতরণের পাশাপাশি গাছগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা ও তদারক করা হয়।

রোপণ করা গাছে ধরেছে ফল : তাদের উদ্যোগে দৌলতপুর উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের কৈপাল-হিসনাপাড়া সড়কে ২০২৪ সালে ১০০টি আম্রপালি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে এবার প্রায় ৩০টি গাছে ফল ধরেছে। স্থানীয় বাসিন্দা হারুনোর রশিদ জানান, তার বাড়ির সামনে লাগানো একটি গাছ থেকে এবার তিনি ১৭টি আম পেয়েছেন। তার ভাষ্য, পথের পাশের গাছে ফল ধরতে দেখে আশপাশের অনেক পরিবার এখন নিজেরাই ফলদ গাছ লাগাতে আগ্রহী হচ্ছেন।

হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের জয়রামপুর-বেগুনবাড়ি সড়কেও তাদের উদ্যোগে প্রায় ৭০০ সুপারি গাছ রোপণ করা হয়েছে। এসব গাছ এখন বড় হয়েছে। একই সড়কে লাগানো ১৫টি আমগাছের মধ্যে ১৪টিই সুন্দরভাবে বেড়ে উঠছে।

২০২৩ সালে শশীধরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ‘স্মাইল ফর অল’ থেকে পাওয়া আমগাছ তারাগুনিয়া-শশীধরপুর সড়কে রোপণ করেছিলেন। এবার এসব গাছের অধিকাংশেই দ্বিতীয়বারের মতো মুকুল এসেছে।

চারা লাগানোর পরও চলে পরিচর্যা : এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, সাধারণত চারা রোপণের পর অনেকেই আর সেগুলোর খোঁজখবর রাখেন না। কিন্তু এ সংগঠন গাছ লাগানোর পাশাপাশি পরবর্তীতে তারা গাছগুলোর পরিচর্যাও করেন।

নাসির উদ্দিন বিশ্বাস বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ লিয়াকত আলী বলেন, তারা গাছ রোপণের পর যেভাবে পরিচর্যা করছেন, তাতে একটি গাছও মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। গাছ লাগানোর পর সার, পানি দেওয়াসহ সব ধরনের পরিচর্যা করা হয়। বিষয়টি এলাকায় সাড়া ফেলেছে।

সভা-সেমিনারে গাছ লাগানোর গুরুত্ব: শুধু গাছ লাগানোর মধ্যেই সংগঠনটি তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেনি। সাধারণ মানুষকে নিয়ে সভা-সেমিনারেরও আয়োজন করে থাকে।

প্ল্যান্ট হাব : চারা বিতরণের জন্য হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের আল্লারদর্গা এলাকায় একটি ‘প্ল্যান্ট হাব’ করা হয়েছে। বিভিন্ন নার্সারি থেকে নানা জাতের গাছের চারা এনে এখানে রাখা হয়। এরপর ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায় থেকে আবেদনপত্র বা চাহিদা নেওয়া হয়। সেই চাহিদার ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গাছের চারা বিতরণ করা হয়।

সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৯৯টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মোট ৭ হাজার ৩০০টি চারা বিতরণ করা হয়েছে।

সবুজায়নের পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ : সবুজায়নের পাশাপাশি স্থানীয় নারীদের স্বাবলম্বী করতেও উদ্যোগ নিয়েছে এ সংগঠন। তাদের উদ্যোগে বিনা মূল্যে নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরই মধ্যে দুই শতাধিক নারী এ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল রিফায়েতপুর ইউনিয়নের হরিণগাছি মোল্লাপাড়ায় ১৭ জন নারী শিক্ষার্থী নিয়ে প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। প্রশিক্ষক আরিফা আবেদিন তাদের প্রশিক্ষণ দেন। এ পর্যন্ত ৮টি ব্যাচে প্রায় ২০০ নারী বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রতিটি ব্যাচের সেরা একজন প্রশিক্ষণার্থীকে একটি করে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া নারীদের সেলাইয়ের উপকরণও দেওয়া হয়।

ফিলিপনগর ইউনিয়নের চর সাধীপুরের বাসিন্দা গৃহবধূ রুনা বেগম বলেন, বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। তার মতো আরও নারীরা এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারবেন।