পাঁচ বছরে বাংলাদেশ এশিয়ার তিন অর্থনীতিকে টপকাবে
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির আকার দাঁড়াবে ৬৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩২তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রাক্কলন ও কানাডাভিত্তিক গণমাধ্যম ‘ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট’-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ‘দ্য ১৫০ ট্রিলিয়ন ডলার গ্লোবাল ইকোনমি ইন ২০৩০’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী তিন অর্থনীতি-মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও হংকংকে টপকে যাবে।
এশিয়ার ৩ পরাশক্তি ও ইউরোপীয় অর্থনীতিকে পেছনে ফেলার সমীকরণ
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালে আন্তর্জাতিক জিডিপি সূচকে বাংলাদেশ শুধু অঞ্চলের শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোকেই পেছনে ফেলবে না, বরং ইউরোপের উন্নত দেশকেও টেক্কা দেবে।
বাংলাদেশ (৬৭৭ বিলিয়ন ডলার): ধারাবাহিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং শিল্প খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ৩২তম স্থানে উন্নীত হবে।
মালয়েশিয়া (৬৭২.৫ বিলিয়ন ডলার): ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী অর্থনীতি হলেও ২০৩০ সালে মালয়েশিয়া অবস্থান করবে ৩৩তম স্থানে।
ভিয়েতনাম (৬৬৭.৫ বিলিয়ন ডলার): ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের বৈশ্বিক হাব হয়ে ওঠা ভিয়েতনাম অবস্থান করবে ৩৪তম স্থানে।
ডেনমার্ক (৫৮৯.২ বিলিয়ন ডলার): ইউরোপীয় উচ্চ আয়ের এই সমৃদ্ধ দেশটি বৈশ্বিক সূচকে থাকবে ৪০তম স্থানে।
হংকং (৫৩৬.৯ বিলিয়ন ডলার): বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ও আর্থিক কেন্দ্র হংকং নেমে যাবে ৪২তম স্থানে।
উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের অভ্যন্তরে সরকারি ও বেসরকারি খাতের পণ্য ও পরিষেবার মোট মূল্যমান নির্ধারণের মাধ্যমে জিডিপির এই আকার পরিমাপ করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ তার ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখে বৈশ্বিক সূচকে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করছে।
শীর্ষ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
প্রতিবেদনটিতে বিশ্বের প্রায় ১৮০টি দেশের জিডিপির তুলনামূলক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে স্পষ্ট দেখা যায়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে কীভাবে বন্টিত হতে যাচ্ছে।
১. পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য:
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালেও বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে শীর্ষ স্থান ধরে রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির জিডিপির আকার বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৩৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা একাই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশের (২৫.১ শতাংশ) বেশি অবদান রাখবে।
২. দ্বিতীয় স্থানে চীন:
যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্ব অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহৎ শক্তি হিসেবে থাকবে চীন। ২০৩০ সালে দেশটির সম্ভাব্য অর্থনীতির আকার পৌঁছাবে প্রায় ২৬ ট্রিলিয়ন ডলারে।
৩. জার্মানি ও ভারতের মধ্যে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা:
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক স্থান দখল করতে ভারত ও জার্মানির মধ্যে দেখা যাবে অভূতপূর্ব হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা। পূর্বাভাস বলছে, এই দুই দেশের জিডিপির ব্যবধান নেমে আসবে মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলারে। জার্মানির জিডিপি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬,১৭৮ বিলিয়ন ডলার এবং ভারতের জিডিপি ধরা হয়েছে ৬,১৭৩ বিলিয়ন ডলার। এর ঠিক পরপরই ৫,১৪৮ বিলিয়ন ডলার নিয়ে ৫ম অবস্থানে থাকবে যুক্তরাজ্য।
৪. শীর্ষ ১০ দেশের শক্ত অবস্থান:
বৈশ্বিক সূচকে শীর্ষ ১০ অর্থনৈতিক শক্তির তালিকায় বাকি পাঁচটি দেশ হচ্ছে জাপান, ফ্রান্স, ব্রাজিল, ইতালি এবং কানাডা।
প্রাক্কলন অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশ মিলেই বৈশ্বিক মোট জিডিপির ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করবে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা ও চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত ও এশীয় শতাব্দীর উত্থান
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এর বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যাবে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপিতে যোগ হবে প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অর্থনৈতিক উল্লম্ফনের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো বিশ্বের অর্থনীতির মোট আকার ১৫০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির সিংহভাগ শক্তি জোগাবে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ, ভারত ও ফিলিপাইনের মতো এশীয় দেশগুলোতে সস্তা শ্রম, অভ্যন্তরীণ বিশাল ভোক্তা বাজার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে বৈশ্বিক উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু পশ্চিমা বিশ্ব থেকে ক্রমশ এশিয়ায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির এই প্রাক্কলিত উল্লম্ফন কেবল জিডিপির সংখ্যার বৃদ্ধি নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বাণিজ্য সক্ষমতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষমতার এক বিশাল মাইলফলক। নীতিগত সহায়তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হলে পূর্বাভাস অনুযায়ী বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিশ্বের শীর্ষ ৩২তম অর্থনীতির কাতারে গিয়ে দাঁড়াবে।
