গার্মেন্ট শিল্পে মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
গার্মেন্ট শিল্পে মজুরি বোর্ড গঠনের দাবিতে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের বিক্ষোভ মিছিল দেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের বাঁচার মতো মজুরি নির্ধারণ, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু, ছাঁটাই বন্ধ, গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিরসন এবং শ্রমিকদের জীবন ও কর্মসংস্থান রক্ষার দাবি জানিয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। পাশাপাশি অবিলম্বে গার্মেন্ট শিল্পের শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন, সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক হত্যার বিচার এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংগঠনের এক বিক্ষোভ সমাবেশে এসব দাবি জানানো হয়। গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষের সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দীলিপ দাশের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শ্রমিক নেতা মনজুরুল আহসান খান, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান শামীম, সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ শাজাহান, সহ-সভাপতি জিয়াউল কবির খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা দুলাল সাহা, আজিজুল ইসলাম, শাহিন আলম প্রমুখ।
সমাবেশে শ্রমিক নেতা মনজুরুল আহসান খান বলেন, ‘তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে দেশের উৎপাদনমুখী অর্থনীতি চলতে পারে না। একইভাবে অভুক্ত ও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত শ্রমিকদের দিয়ে দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্পও কখনও টেকসই হতে পারে না। শিল্পের উৎপাদন ও শ্রমিকের জীবনমান পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তাই একদিকে অবিলম্বে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান এবং অন্যদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে দ্রুত নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে।’ তিনি প্রতি ২ বছর পরপর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবিও করেন।
গার্মেন্ট শিল্পে মজুরি বোর্ড গঠনের দাবিতে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের বিক্ষোভ মিছিল
সমাবেশে শ্রমিকনেতা মন্টু ঘোষ বলেন, ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৩ অনুযায়ী শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্বিন্যাসের বিধান রয়েছে। সেই হিসাবে এ বছরে নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করার কথা। কিন্তু সরকার তার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এদিকে সরকারের ৬ মাসে মুদ্রাস্ফীতির কারণে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে শ্রমিকের জীবন ওষ্ঠাগত। তাই অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা জরুরি। সেই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে প্রায় শতাধিক কারখানা এরইমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারকে দ্রুত এর সমাধান করতে হবে। বন্ধ কারখানা চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। এবং শ্রমিকদের মান সম্মত জীবনের জন্য দ্রুত রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।’
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান শামীম বলেন, ‘খাদ্য, বাসাভাড়া, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ওষুধসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও কিন্তু সে অনুযায়ী শ্রমিকদের আয় বাড়েনি। ফলে সংসারের ব্যয় মেটাতে অনেক শ্রমিককে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে এবং অনেকে ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন। এমতাবস্থায় সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। তার সাথে সংগতি রেখে দ্রুত শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি করা দরকার।’
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজের গ্যাস সিলিন্ডারের বিষক্রিয়ায় ৫ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সরকার শ্রমিকদের জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। দ্রুত এই ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গাজীপুর ছাড়াও আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, উত্তরার বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রয়েছে। কোনো কোনো কারখানায় তিন-চার মাসের বেতনও বকেয়া রয়েছে, উপরন্তু শ্রমিকরা অযথা মিথ্যা কারণ দেখিয়ে তাদের ছাঁটাই করেই চলছে। কোনো রকম পাওনা পরিশোধ করছে না। এক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।’
শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ শাজাহান বলেন, ‘মজুরি বৃদ্ধির দাবি করে গত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে পতিত স্বৈরাচারের গুলিতে চারজন শ্রমিকনেতা প্রাণ হারিয়েছেন। গণ-অভ্যুত্থানের পরেও ন্যায্য দাবি উত্থাপন করে শ্রমিকদের জীবন দিয়েছে। বর্তমান সরকারও শ্রমিকদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছ না। সরকারের কাছে মুখে নয় কাজে দৃষ্টিভঙ্গি বদলের প্রমাণ দিতে হবে।’
শ্রমিক নেতা জিয়াউল কবির খোকন বলেন, ‘শ্রমিকের জীবনের সংকটকে আড়াল করে রাখার কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নাই। শ্রমিকের দাবির মধ্যে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজা পুরাতন স্বৈরাচারী অপকৌশল। সরকারকে দায়িত্ববোধ থেকে শ্রমিকের সমস্যার সুরাহা করতে হবে। শ্রমিকরাও দায়িত্বশীলতার সাথে সকল দেশবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী চক্রান্ত মোকাবিলা করবে। অতীতেও আমরা দেখেছি কারখানাভিত্তিক রেশন ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ গৃহীত হয়নি।’
সমাবেশে বক্তারা বলেন, গত বছর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হলেও তা নির্ধারণ করা হয় মাত্র ১২,৫০০ টাকা। কিন্তু এখনও অনেক কারখানা এই মজুরিও দিচ্ছে না এবং শ্রমিক ছাঁটাই অব্যাহত রয়েছে। মালিকপক্ষ নানান অজুহাত দেখিয়ে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করছে না। সরকার দ্রুত এসবের ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বৃহৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায় করে ছাড়বে বলে জানিয়েছেন বক্তারা।
বক্তারা আরও বলেন, দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস গার্মেন্ট শিল্প। অথচ এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি শ্রমিকরা আজও ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও চাকরির নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় ক্রমাগত কমছে। বর্তমান বাজারদরে শ্রমিকদের জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই শ্রমিকদের জীবনমান বিবেচনায় নিয়ে অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে ন্যায্য ও সময়োপযোগী মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
সমাবেশ থেকে দাবি আদায়ে সপ্তাহব্যাপী সকল শিল্প এলাকায় মিছিল-সমাবেশের কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়। শ্রমিক সমাবেশ শেষে একটি মিছিল কদমফুল ফোয়ারা ঘুরে তোপখানা সড়ক হয়ে পল্টন মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।
