চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানিতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের চর চাকলা গ্রামের মরা নদীটি মূলত পদ্মার একটি শাখা। সম্প্রতি বৃষ্টিতে ভরে ওঠে নদীটি। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সেখানে গোসলে নেমে ডুবে যায় পাঁচটি শিশু। আশপাশের লোকজন তা দেখে নদীতে নামে। তবে কাউকেই জীবিত উদ্ধার করা যায়নি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর থানার ওসি একরামুল হক জানিয়েছেন, চর চাকলা গ্রামের ‘মরা’ নদীতে গোসলে নেমে ডুবে গেছে পাঁচটি মেয়েশিশু। তারা হলো- মাসুদের দুই মেয়ে সুমাইয়া (১০) ও আবিবা (৮), শরিফুলের মেয়ে শরিফা (১২) এবং নেজামউদ্দিনের দুই মেয়ে শুমাইয়া (১২) ও সুরাইয়া (৯)। তাদের বাড়ি একই গ্রামে।
এর আগে, একই জেলায় গত ১৩ আগস্ট দুই শিশু, ১৬ আগস্ট এক শিশু, ১০ জুলাই একজন এবং ৩১ মে তিন শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। চিত্রটি ভয়াবহ। মরা নদী, বাড়ির পাশের পুকুরঘাট কিংবা হাঁস পালনের গর্ত-স্থান যাই হোক না কেন, পরিণতি একটাই। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত কয়েক মাসে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর যে দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়। এটি মূলত একটি নীরব মহামারির ভয়াবহ রূপ, যা সারা দেশে প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে গড়ে ৪০টিরও বেশি শিশুর প্রাণ। অথচ রাষ্ট্র, সমাজ বা সংবাদমাধ্যম-কারও কাছেই এটি ডেঙ্গু বা সড়ক দুর্ঘটনার মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না।
সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মরা নদী, শিবগঞ্জের পাগলা নদী, ভোলাহাটের গর্ত এবং নাচোলের পুকুরে ডুবে বেশ কয়েকটি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে, থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয় এবং তারপর সবাই ভুলে যায়। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (CIPRB)-এর তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ হাজারের বেশি শিশু স্রেফ পানিতে ডুবে মারা যায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এখন এটি।
ঘটনাগুলোর ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই মৃত্যুগুলোর পেছনে ‘কপাল দোষের’ চেয়ে কাঠামোগত অবহেলাই বেশি দায়ী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পানিতে ডুবে মৃত্যুর শিকার হওয়া শিশুদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের বয়স এক থেকে চার বছরের মধ্যে। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুই মারা যায় তাদের বসতবাড়ির মাত্র ২০ মিটারের মধ্যে থাকা কোনো অরক্ষিত পুকুর, ডোবা বা গর্তে পড়ে।
এই ঘটনার পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে একটি সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটনাই ঘটে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে। ঠিক এই সময়টিতে গ্রামীণ মায়েরা বা অভিভাবকরা গৃহস্থালি কাজ, রান্না বা মাঠের কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। ফলে শিশুদের ওপর নজরদারির ঘাটতি তৈরি হয়। গ্রামে বা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে কর্মজীবী মায়েদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক চাইল্ড কেয়ার বা ডে-কেয়ার সেন্টারের চরম সংকট থাকায়, শিশুরা অরক্ষিত অবস্থাতেই বাড়ির আশেপাশে খেলাধুলা করে এবং অগোচরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মৃত্যুকে আর ‘নিছক দুর্ঘটনা’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর সমাধান খুব জটিল কিছু নয়। বাড়ির আশেপাশের জলাশয় বা পুকুরে বেড়া দেওয়া (ফেন্সিং), সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শিশুদের নিরাপদ রাখার জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করা এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের বাধ্যতামূলক সাঁতার শেখানো- এই সাধারণ পদক্ষেপগুলোই হাজারো শিশুর প্রাণ বাঁচাতে পারে। কান্নাকাটি আর আহাজারি দিয়ে হয়তো সংবাদের কাটতি বাড়ে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না। প্রতিদিন ৪০টি লাশের এই মিছিল থামাতে হলে রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় শিশু সুরক্ষাকে এখনই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
