দেশের পর্যটন কেন্দ্র নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত, ইউনেসকো স্বীকৃত সুন্দরবন, সবুজ পাহাড়ের বিস্তৃত গালিচা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনার নদী জল, মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের ঐতিহাসিক নিদর্শন, মোঘল ও প্রাচীন বাংলার শিল্প-সাহিত্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং বৈচিত্র্যময় স্থানীয় সংস্কৃতি-সবই বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনার মূল সম্পদ| বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত তিনটি নিদর্শন-পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং মহাস্থানগড়-এই দেশের ঐশ্বর্য ও সম্ভাবনারই প্রতীক| সব মিলিয়ে পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে| তাই দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন কেন্দ্র চিহ্নিত করে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে সরকার| একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন উন্নয়নের লক্ষ্যে 'জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০২৬' প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে|

গতকাল রোববার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শওকত আরা আক্তারের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এ তথ্য জানান| এসময় অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম| মন্ত্রী জানান, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে এবং দেশের পর্যটন আকর্ষণগুলোকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে| এর অংশ হিসেবে সারাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে| এসব কেন্দ্র নিয়ে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে| পর্যটন খাতের তথ্যের ঘাটতি দূর করে পরিকল্পিত উন্নয়নের লক্ষ্যে 'ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট' প্রণয়নের কাজও চলমান রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী| তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে 'কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম' মডেলে পর্যটন স্পট উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্রগুলোর টেকসই উন্নয়ন করা হবে|

পর্যটকদের নিরাপত্তা বাড়াতে ট্যুরিস্ট পুলিশের জনবল বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সংসদে জানান মন্ত্রী| এদিকে দেশের সাংস্কৃতিক পর্যটনের বিকাশে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করবে| এ লক্ষ্যে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত হয়েছে| মন্ত্রী জানান, সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর এ বিষয়ে 'স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর' (এসওপি) প্রণয়ন করা হবে| পাশাপাশি কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা হবে|

বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে 'বিউটিফুল বাংলাদেশ' ব্র্যান্ডিং কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে| এ লক্ষ্যে একটি ওয়েবসাইট তৈরির কাজও চলছে বলে জানান পর্যটনমন্ত্রী| সরকারের এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসইভাবে গড়ে তুলে দেশি-বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করার লক্ষ্য রয়েছে বলে সংসদে জানান তিনি|

পর্যটন শিল্পের বিকাশ-সমস্যা ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ| নদীমাতৃক ভূখণ্ড, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্রসৈকত, সবুজ বনানী, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি-সব মিলিয়ে এটি একটি পর্যটন সম্ভাবনাময় দেশ| কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই সম্ভাবনা আজও যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি| প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপালে ছুটে যায়; অথচ বাংলাদেশের কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, সিলেট বা পাহাড়ি অঞ্চলগুলো পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায় না| প্রশ্ন হচ্ছে-কেন আমরা পারছি না পর্যটনকে অর্থনীতির শক্তিশালী খাতে পরিণত করতে?

প্রথমত, আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতা একটি বড় বাধা| পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য সড়ক যোগাযোগ, নিরাপদ পরিবহন, মানসম্মত হোটেল, তথ্যকেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা অপরিহার্য| কিন্তু দেশের অধিকাংশ পর্যটন এলাকায় যাওয়ার রাস্তা এখনও সংকীর্ণ, অনিরাপদ এবং অপরিকল্পিত| কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রেও যানজট, পানি সংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দখলদারিত্ব বড় সমস্যা| সিলেট বা বান্দরবানের মতো পাহাড়ি অঞ্চলেও পর্যাপ্ত হোটেল বা রিসোর্ট নেই, যেগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে| ফলে স্থানীয় পর্যটক ছাড়া বিদেশিরা তেমন ভরসা পান না|

দ্বিতীয়ত, পর্যটন বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা এখনও পেশাদার নয়| সরকার ও বেসরকারি খাতে অনেক প্রকল্প নেয়া হয়, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন পর্যায়েই গলদ দেখা যায়| অনেক জায়গায় 'ইকো ট্যুরিজম' বা 'কালচারাল ট্যুরিজম' ধারণা তুলে ধরা হলেও পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির সুরক্ষা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না| আমাদের পর্যটন খাত এখনও 'সিজনাল বিজনেস'-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে স্থায়ী কর্মসংস্থান বা দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব আয়ের দিকটি অবহেলিত|

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পর্যটন শিল্পের বড় প্রতিবন্ধকতা| দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারী বা পর্যটক-কেউই আগ্রহী হয় না| নির্বাচনকালীন সহিংসতা, অবরোধ, হরতাল, কিংবা হঠাৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দেশের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে| বিদেশি মিডিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতার খবর প্রকাশ হলে পর্যটকরা স্বাভাবিকভাবেই নিরাপদ বিকল্প খুঁজে নেয়| অথচ পর্যটন এমন একটি খাত, যা স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ছাড়া কখনো টেকসইভাবে বেড়ে উঠতে পারে না|

চতুর্থত, নিরাপত্তা ও আচরণগত সমস্যা পর্যটন বিকাশে বড় প্রতিবন্ধকতা| বিদেশি পর্যটকরা অনেক সময় হয়রানির শিকার হন, উপযুক্ত তথ্য না পাওয়ায় বিভ্রান্ত হন| পর্যটন এলাকাগুলোতে প্রশিক্ষিত গাইড, ইংরেজি ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন কর্মী বা তথ্যকেন্দ্রের অভাব স্পষ্ট| তাছাড়া, অনেক সময় স্থানীয়দের আচরণ বা আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে| একটি দেশের ইমেজ গঠনে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ|

পঞ্চমত, আমরা এখনও পর্যটন প্রচারণায় পিছিয়ে আছি| বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থাপন করার মতো কার্যকর ব্র্যান্ডিং নেই| বিমানবন্দর, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা বিদেশি সংবাদমাধ্যমে আমাদের পর্যটন নিয়ে কোনো ধারাবাহিক প্রচার দেখা যায় না| নেপাল 'বিউটিফুল নেপাল', মালয়েশিয়া 'ট্রুলি এশিয়া', শ্রীলঙ্কা 'ওয়ান্ডার অব এশিয়া'- এই স্লোগানগুলো বিশ্বজুড়ে পরিচিত| কিন্তু বাংলাদেশ এখনও কোনো একক, প্রভাবশালী পর্যটন ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারেনি|

তবে সবকিছুই নেতিবাচক নয়| বাংলাদেশে পর্যটনের সম্ভাবনা অপরিসীম| বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পাহাড়বেষ্টিত পার্বত্য চট্টগ্রাম, চা-বাগানের নগরী সিলেট, প্রাচীন নগরগুচ্ছ মহাস্থানগড়, ময়নামতি কিংবা গৌড়- এসব স্থান বিশ্বমানের পর্যটন আকর্ষণ হতে পারে| বিশেষ করে ইকো ট্যুরিজম, কালচারাল ট্যুরিজম, রিলিজিয়াস ট্যুরিজম ও মেডিকেল ট্যুরিজমে বাংলাদেশ নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে| সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বা কাপ্তাই হ্রদকে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনায় উন্নয়ন করলে আন্তর্জাতিক ক্রুজ পর্যটনও সম্ভব|

সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটন খাতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে| বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় নতুন নীতিমালা গ্রহণ করেছে, 'ডেল্টা প্ল্যান' ও 'স্মার্ট বাংলাদেশ' উদ্যোগেও পর্যটনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে| বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেমন নতুন হোটেল নির্মাণ, ওয়েবসাইট উন্নয়ন, পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট চালু ইত্যাদি| তবে এসব উদ্যোগ এখনও সীমিত পরিসরে আছে; সার্বিক রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত ও আন্তঃমন্ত্রণালয় পরিকল্পনা| এখন সময় এসেছে পর্যটনকে শুধুমাত্র অবসর বা আনন্দের খাত হিসেবে না দেখে একটি অর্থনৈতিক শিল্প হিসেবে দেখার| দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তাদের জিডিপির বড় অংশ পর্যটন থেকে অর্জন করছে| বাংলাদেশেও যদি বছরে শুধু ১০ লাখ বিদেশি পর্যটককে আকর্ষণ করা যায়, তবে তা থেকে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব অর্জন সম্ভব| এর সঙ্গে যুক্ত হবে স্থানীয় পণ্যের বিক্রি, কারুশিল্পের প্রসার, কৃষিপণ্য সরবরাহ, রেস্তোরাঁ ব্যবসা, পরিবহন, এমনকি তথ্যপ্রযুক্তি খাতও| অর্থাৎ পর্যটন হতে পারে সার্বিক অর্থনৈতিক চক্রের চালিকা শক্তি|

একইসঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে|

কোনো জায়গার উন্নয়ন যেন তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে পরিকল্পনার শুরু থেকেই| স্থানীয় মানুষকে পর্যটন ব্যবসার অংশীদার করতে হবে, যাতে তারা নিজেদের সংস্কৃতি, খাবার, সংগীত বা হস্তশিল্প দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে| বাংলাদেশের পর্যটন খাত এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে| একদিকে সীমাহীন সম্ভাবনা, অন্যদিকে বাস্তব সমস্যা|

আমরা যদি অবকাঠামো উন্নয়ন, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও প্রচারণা জোরদার করতে পারি, তবে বাংলাদেশও দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে| এই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বিশ্বমানের নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি|

অতএব, পর্যটন শিল্পের বিকাশ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; বেসরকারি খাত, উদ্যোক্তা, মিডিয়া এবং নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে| দেশপ্রেমের এক বাস্তব প্রকাশ হতে পারে- নিজ দেশকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করা, তার সৌন্দর্যকে পরিচিত করানো| বাংলাদেশের নদী, পাহাড়, মানুষ ও সংস্কৃতি- সবই এক অনন্য গল্প| এই গল্পটা আমাদেরই বলতে হবে, বিশ্বাস নিয়ে, পরিকল্পনা নিয়ে, ভবিষ্যতের আশায়|