শুক্রবারের বিশেষ খবর
গণ-অর্থায়নে গড়েছেন ৩৫ একরের খামার
প্রকৌশলবিদ্যা পড়ে কৃষি উদ্যোক্তা
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
গাজী মুনছুর আজিজ

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার বামনগাঁও গ্রামে প্রায় ৩৫ একর জমিতে AgroTortoise (অ্যাগ্রো টরটোইজ) বা 'কৃষি কচ্ছপ' নামে সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন মেছবাহুল ইসলাম। তবে এ খামার গড়ার সময় তার হাতে ছিল না প্রয়োজনীয় মূলধন। 'ক্রাউডফান্ডিং' বা গণ-অর্থায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে বিনিয়োগ নিয়ে গড়ে তোলেন খামারটি। এক কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগে মাত্র তিন বছরেই আর্থিকভাবে সফল হয়েছেন তিনি।
মেছবাহুলের এ খামার এখন শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প নয়, আশপাশের তরুণদের কাছেও এটি হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার কেন্দ্র। স্থানীয় অনেক কৃষক নিয়মিত তার কাছে কৃষি বিষয়ে পরামর্শ নিতে আসেন।
প্রকৌশলী থেকে কৃষি উদ্যোক্তা : মেছবাহুল ইসলামের বাবা লুৎফর রহমান পেশায় শিক্ষক। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করেন তিনি। এরপর চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। পৈতৃক ২০ একর জমির সঙ্গে আরও ১৫ একর জমি বর্গা নিয়ে শুরু করেন কৃষিকাজ। প্রথমে গড়ে তোলেন 'অ্যাগ্রো টরটোইজ' নামে কৃষিসেবা কেন্দ্র। খামারের আয় থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন অফিস ও গুদামঘর।
সম্প্রতি খামার ঘুরে দেখা যায়, চার বিঘা জমির মরিচখেতে শ্রমিকেরা মরিচ তুলছেন। পুকুরের চারপাশে তারকাঁটার বেড়ার সঙ্গে তৈরি করা মাচায় ঝুলছে করলা। সারিবদ্ধ পেঁপেগাছে ধরেছে ফল। নার্সারিতে শ্রমিকেরা টবে লিচুর চারা প্রস্তুত করছেন। কলাবাগানে ঝুলছে বড় বড় কাঁদি, পাশেই তৈরি হচ্ছে নতুন কলার চারা। বর্তমানে খামারে ১০ একর আয়তনের তিনটি পুকুরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে। প্রায় ১০ একর জমিতে উৎপাদন করা হচ্ছে কলা, পেঁপে, মরিচ, ক্যাপসিকাম, শসা, আদা, করলাসহ নানা ধরনের ফসল। রয়েছে দেশি জাতের আটটি গরু, হাঁস পালন, ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন এবং সুগন্ধি জাতের ধানের আবাদ।
অফিসসংলগ্ন জমিতে আম, লিচু, আঙুরসহ বিভিন্ন ফলের চারা উৎপাদন ও বিক্রি করা হয়। খামারে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক কাজ করেন। চলতি মৌসুমে শুধু লিচু, কলা ও করলা বিক্রি করেই ১০ লাখ টাকার বেশি আয় হয়েছে।
খামারে উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট নিজেদের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি আশপাশের কৃষকদের কাছেও বিক্রি করা হচ্ছে। খামারে রয়েছে আধুনিক কৃষিযন্ত্র। পুরো এলাকা রাখা হয়েছে সিসিটিভির আওতায়। অফিসে বসেই অনলাইনে পাওয়া ফরমায়েশ অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে চারা পাঠানো হয়। মাঝে মাঝে ড্রোনের সাহায্যে অফিসে বসেই খামারের বিভিন্ন অংশের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন মেছবাহুল। কৃষি বিভাগ থেকেও তিনি নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন।
ক্যাম্পাস থেকেই ব্যবসার শুরু : বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ব্যবসার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় মেছবাহুলের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির দুই বছরের মাথায় বিয়ে করেন তিনি। স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ ছিল। বাড়তি খরচ মেটাতে চুয়েট ক্যাম্পাসে ঘরে তৈরি খাবারের ব্যবসা শুরু করেন তারা। 'শৈলআঁখির রন্ধনশৈলী' নামে ফেসবুকে একটি পেজ খুলে খাবারের প্রচার চালান। চুয়েটের আবাসিক হল ও আশপাশের মেসগুলোতে তাদের রান্না করা খাবারের চাহিদা তৈরি হয়।
২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় তারা দিনাজপুরে ফিরে আসেন। ঘরবন্দী সময়ে কিছু একটা করার ইচ্ছা থেকে ফুল-ফলের নকশায় জুয়েলারি তৈরি শুরু করেন। পাশাপাশি অনলাইনে আম বিক্রিও শুরু করেন।
মেছবাহুল ইসলাম বলেন, দু'টি ব্যবসাতেই ভালো সাড়া পেয়েছিলেন তারা। মাত্র দুই সপ্তাহে খরচ বাদ দিয়ে ৪৮ হাজার টাকা লাভ করেন। তখন ব্যবসার পাশাপাশি অনলাইনে ক্লাসও করতে হতো। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় খাদ্যসংকটের বিষয়টি তার স্ত্রী মুম-তাসিনকে ভাবিয়ে তোলে। এরপর নিজেরাই চারা উৎপাদন করে বিভিন্ন সবজির চাষ শুরু করেন।
ইউটিউব থেকে কৃষির নানা বিষয় শেখেন তিনি। প্রথমবার স্কোয়াশ ও ক্যাপসিকাম চাষ করে ভালো লাভ পান। এরপর থেকেই কৃষির প্রতি আলাদা এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয় তার।
গণ-অর্থায়নে স্বপ্নপূরণ : ২০২৩ সালে স্নাতক শেষ করে পুরোপুরি কৃষিভিত্তিক ব্যবসায় মনোযোগ দেন মেছবাহুল। কিন্তু শুরুতেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় মূলধনের সংকট। তখনই তার মাথায় আসে 'ক্রাউডফান্ডিং' বা গণ-অর্থায়নের ধারণা। মেছবাহুল বলেন, এ বিষয়ে জানতে তিনি পড়াশোনা শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন। সেই শিক্ষক দুই লাখ টাকা বিনিয়োগও করেন। এরপর ধীরে ধীরে আরও অনেকে তার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন।
বর্তমানে অ্যাগ্রো টরটোইজ খামারে ৩৭ জন বিনিয়োগকারী রয়েছেন। তাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ এক কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এরই মধ্যে বিনিয়োগকারীদের অনেকে লভ্যাংশ পেতে শুরু করেছেন। চলতি বছর প্রায় ৮০ শতাংশ বিনিয়োগকারী তাদের বিনিয়োগের বিপরীতে ৪.৪৪ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পেয়েছেন। মোট লভ্যাংশের পরিমাণ প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। খামারের একজন বিনিয়োগকারী ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রকৌশলী তানজিম মৃদুল। তিনি অ্যাগ্রো টরটোইজের 'পুকুর বাগান-১' ও ভার্মি কম্পোস্ট প্রকল্পে বছরখানেক আগে চার লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছেন। এবার তিনি কিছুটা মুনাফাও পেয়েছেন। তানজীর হোসেন বলেন, বিশ্বস্ততার জায়গা থেকেই মূলত বিনিয়োগ করার সাহস পেয়েছি। তার উদ্যোগে যেমন তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান, তেমনি আশপাশের তরুণ ও কৃষকেরাও পাচ্ছেন কৃষি নিয়ে নতুনভাবে ভাবার অনুপ্রেরণা।
