ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে সারা দেশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রোববার সচিবালয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে এক সভায় প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন।
সভায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়ার বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন করার নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে দুর্যোগব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্টের কর্মীদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে সংগঠিত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার ওপর জোর দেন তিনি।
সভায় উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসুবিধা ও রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে উপজেলা পর্যায় থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের ব্যবহারের জন্য মশারি সরবরাহেরর বিষয়ে আলোচনা হয়। আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশার মাধ্যমে যাতে অন্য ব্যক্তির শরীরে ডেঙ্গুর ভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য হাসপাতালে রোগীদের মশারির ভেতর রাখার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রশাসক আবদুস সালাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
হামে মৃত্যু হাজার ছুঁইছুঁই : সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হাম ও এর উপসর্গে দেশে শিশুর মৃত্যু থামছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ সময়ে ৫৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছর নিশ্চিত হামে ১০০ জন এবং এর উপসর্গ নিয়ে ৮৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুই মিলিয়ে গেল ৬ মাসে ৯৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, শনিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রাম, খুলনা এবং সিলেট বিভাগে একজন করে মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গেল ১৫ মার্চ থেকে হামের তথ্য প্রকাশ করে আসছে।
হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৪০১ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এর পরেই আছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১৫৫ জন। এছাড়া রাজশাহীতে ৯২, চট্টগ্রামে ৬৫, বরিশালে ৫৬, ময়মনসিংহে ৭৫, খুলনায় ৩৬ ও রংপুর বিভাগে ১৪ জন মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গেল ২৪ ঘণ্টায় আরও ১ হাজার ৪৩ জন হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ৯৫৪ জন। ঢাকা বিভাগে ভর্তি ৩১৯ জন, রাজশাহীতে ২৩, সিলেটে ১১২, চট্টগ্রামে ২৩৮, বরিশালে ১১৬, ময়মনসিংহে ৪৮, খুলনায় ৮৫, রংপুরে ১৩ জন। এ নিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা দাঁড়াল ১ লাখ ৪৪ হাজার ১৬৮ জনে। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭২ জন হাসপাতাল ছেড়েছে।
আর দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৪৮। আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৬৯৬। সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে অনেকেই হাসপাতালে যান। তবে সবার নমুনা পরীক্ষা না হওয়ায় হামের বিস্তৃতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে সরকারি হিসাবের উপরই পরিসংখ্যানের জন্য ভরসা করতে হচ্ছে। টিকা দেওয়ার পরেও হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন শিশুর প্রাণহানি হচ্ছে। সংক্রমণও কমছে না।
বিশেষজ্ঞরা মোটা দাগে হামের প্রকোপ না কমার দুটি কারণ বলেছেন। এগুলো হলো— অনেক শিশুর টিকা না পাওয়া এবং হাম মোকাবিলায় 'গাইডলাইন' বা নির্দেশিকা না করা। হাম পরিস্থিতি এতদিন পর্যন্ত লম্বা হওয়া এবং মৃত্যু ঠেকাতে না পারার বিষয়ে তারা সরকারের অবহেলা দেখছেন। তারা বলছেন, টিকা দেওয়ার পর এখন অ্যান্টিবডি যাচাই করা উচিত, আদতেই টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হল কিনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় মতো সঠিক সিদ্ধান্ত মাঠে বাস্তবায়ন করা গেলে হামের প্রকোপ এ পর্যায়ে আসত না।
ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তির নতুন রেকর্ড
সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এসময় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন চারজন। গতকাল রোববার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর আগে, গত মঙ্গলবার সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩২৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বলে নিয়মিত প্রতিবেদনে জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন রোগীদের নিয়ে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৫৯০ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় তিনজন ও ঢাকা বিভাগে একজন মারা গেছেন। তাদের তিনজন নারী ও একজন পুরুষ। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সারাদেশে ১১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৪ জন নারী ও ৫২ জন পুরুষ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বোচ্চ ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে জুন মাসে সারাদেশে ২ হাজার ৯০৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জুলাই মাসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় নয় হাজার ২০৬ জনে। গতমাসে অর্থাৎ আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। চলতি মাসে এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছয় হাজার ৭৪৪ জন।
