পোশাক রপ্তানিতে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশ
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৭৪৯ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৭১৩ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ একবছরের ব্যবধানে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের সংকলিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে। রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। পাশাপাশি প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন ও বিকল্প বাজারেও রপ্তানি বাড়ছে। তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর। ফলে মোট রপ্তানিতে ইউরোপের অংশ কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি সবচেয়ে ভালো করেছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে দেশটিতে ১৬১ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ।
শুধু রপ্তানি বাড়েনি, মোট পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশও বেড়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মোট রপ্তানির ২০ দশমিক ৩০ শতাংশ গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫২ শতাংশে। এতে বোঝা যায়, চলতি অর্থবছরের শুরুতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। তবে কোনো একটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি ইউরোপের বাইরে অন্যান্য বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পণ্যভিত্তিক রপ্তানি বিশ্লেষণেও ইতিবাচক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। জুলাই-আগস্টে নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৪১৯ কোটি ৩৭ লাখ ৬০ হাজার ডলারের। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৩০ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার ডলারের। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ ওভেনের তুলনায় নিট পোশাক রপ্তানি দ্রুত বাড়ছে। সামগ্রিক পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতে তাই নিট খাতের অবদানও তুলনামূলক বেশি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে ক্রেতাদের চাহিদার পরিবর্তন, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে নিট পোশাকে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। তবে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে উৎপাদন খরচ, জ্বালানি সরবরাহ, শ্রমিক মজুরি ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা— সবকিছুর ওপর নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। জুলাই-আগস্টে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৪৯ কোটি ৩৯ লাখ ১০ হাজার ডলারের। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এর ফলে মোট পোশাক রপ্তানিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ কমেছে। গত বছরের জুলাই-আগস্টে মোট রপ্তানির ৪৭ দশমিক ৮২ শতাংশ ইইউতে গেলেও এবার তা নেমে এসেছে ৪৬ দশমিক ৬১ শতাংশে। অর্থাৎ রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও মোট রপ্তানির তুলনায় ইউরোপের বাজারের গুরুত্ব সামান্য কমেছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রচলিত বাজারের বাইরে অন্যান্য দেশে রপ্তানির অংশ বাড়ছে।
ইইউর দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্রেতা জার্মানি। জুলাই-আগস্টে দেশটিতে ৮০ কোটি ৪৭ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ। অপরদিকে নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং স্পেনে ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। বিপরীতে ফ্রান্সে রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং পর্তুগালে কমেছে ১৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এ চিত্র থেকে বোঝা যায়, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পুরোপুরি দুর্বল হয়নি; বরং দেশভেদে চাহিদার পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে প্রচলিত বাজারের বাইরের দেশগুলো। জুলাই-আগস্টে এসব বাজারে রপ্তানি হয়েছে ১২২ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার ডলারের। আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বিশেষ করে তুরস্কের বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জুলাই-আগস্টে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৯৯ লাখ ৮০ হাজার ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৯৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেশি। সংশ্লিষ্ট তথ্যের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।
ব্রাজিল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজারেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ব্রাজিলে রপ্তানি বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৪ দশমিক ২১ শতাংশ। এর বিপরীতে কয়েকটি বড় বাজারে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রাশিয়ায় রপ্তানি কমেছে ৩৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ, চীনে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ভারতে ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ বিকল্প বাজারের সামগ্রিক চিত্র ইতিবাচক হলেও সব দেশে একই ধরনের প্রবৃদ্ধি নেই। কোথাও দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে, আবার কোথাও বাংলাদেশের রপ্তানি কমছে।
তৈরি পোশাক বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এ খাতের রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর। ফলে কোনো একটি অঞ্চলে অর্থনৈতিক মন্দা, ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া, বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন বা নতুন শুল্ক আরোপ হলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের পরিসংখ্যান অবশ্য দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ধীরে ধীরে বাজারের বৈচিত্র্য বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি তুরস্ক, ব্রাজিল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বাজারে রপ্তানি বাড়ার বিষয়টি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে বাজার বহুমুখীকরণকে টেকসই করতে হলে শুধু পণ্য পাঠালেই হবে না। নতুন বাজারের ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের নকশা, মান, মূল্য, সরবরাহের সময় এবং পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। একইসঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা, সরাসরি যোগাযোগ ও বিপণন সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
প্রথম দুই মাসে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পোশাক খাতের জন্য স্বস্তির খবর হলেও এটিকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বৈশ্বিক পোশাকের বাজার এখনও প্রতিযোগিতাপূর্ণ। ক্রেতারা কম দামে দ্রুত সরবরাহের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও শ্রমমান নিশ্চিত করার বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, বন্দরের দক্ষতা, পণ্য পরিবহনের সময় কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দাম ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় বাজারে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কারণ মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক এখনও এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি মিশ্র কিন্তু আশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরছে।
