সংবাদমাধ্যমে হস্তক্ষেপের ইচ্ছা নেই সরকারের : তথ্যমন্ত্রী

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

সংবাদমাধ্যমে কোনো হস্তক্ষেপের ইচ্ছা সরকারের নেই বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ। তিনি বলেছেন, আজকে আমরা যেখানে আছি, সংবাদমাধ্যম আছে বলেই সেখানে আছি। যার কারণে আজকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যেই পর্যায়ে আমরা আছি, আমার মনে হয় তার সমান সমান ক্রেডিট সংবাদ মাধ্যমেই যায়। 'ইনশাআল্লাহ আমাদের এই সময় প্রো-মিডিয়া পাবেন এবং আমাদের তরফ থেকে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছে নেই।' গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, 'আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, সবাই মিলে কাজ করলে ইনশাআল্লাহ স্বপ্নের বাংলাদেশে, সোনার বাংলাদেশ হবে।' গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, 'সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সার্বজনীন রূপ হলো— গণমাধ্যম সত্য প্রচার করবে এবং অনেক যাচাই-বাছাইয়ের পর সত্য প্রচার করবে। সত্য প্রচার করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি এলেও সেই ঝুঁকি সাংবাদিককে বরণ করে নিতে হবে।' সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে তিনি বলেন, 'প্রচলিত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে রিপোর্টার, নিউজ এডিটর ও এডিটর থাকেন। তারা একটি সংবাদ পরিশুদ্ধ করে এরপর প্রচার করেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো নিউজ এডিটর বা চিফ রিপোর্টার নেই। "কে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, কার ছেলে কার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে— এটা তো সংবাদপত্রের নিউজ হতে পারে না।'

গণতন্ত্রকে বিকশিত ও শক্তিশালী করতে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন এ বিএনপি নেতা।

অনুষ্ঠানে রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, প্রধানমন্ত্রী ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি-১ জাহিদুল ইসলাম রনি, জামায়াতে ইসলামীর এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ডিআরইউর সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা ও অবক্ষয়মূলক কনটেন্ট প্রতিরোধই সরকারের লক্ষ্য : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা থামিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করা এবং জনপরিসরে নৈতিক অবক্ষয়মূলক কনটেন্ট প্রতিরোধ করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান। তিনি বলেন, 'কোনো অবস্থাতেই মুক্তচিন্তা, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বা সাংবাদিকদের দমনের উদ্দেশে কোনো আইন করা হচ্ছে না।' গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে 'সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬'-এর খসড়া পর্যালোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, 'অতীতে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে সংবাদ মাধ্যমকে দমিয়ে রাখা হতো। গণমাধ্যমের ওপর অপব্যবহারের যে প্রবণতা ছিল, বর্তমান সরকার সে বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক। খসড়া আইনে যেন এমন কোনো দ্ব্যর্থবোধক (ডুয়াল মিনিং) শব্দ না থাকে, যা আগামীতে গণমাধ্যমের ওপর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে, সে জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খসড়া পরিমার্জন করা হচ্ছে।' তিনি আরও বলেন, 'বাকস্বাধীনতার নামে বিভিন্ন অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যে অশালীন গালিগালাজ, সাইবার বুলিং ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতাকে বিনষ্ট করছে। আমাদের প্রধান কাজ হলো এই সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা। এই দুটো বিষয়কে কোনো ধরনের সংঘাত ছাড়া কীভাবে সমন্বয় করা যায়, তা নিয়ে অংশীজনদের সাথে আলোচনা চলছে।'

আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, কেবল কঠিন আইন করে সব অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। সাইবার স্পেসে সত্যতা যাচাই না করে যেকোনো মানহানিকর তথ্য বা পোস্ট শেয়ার দেওয়াও যে অপরাধের আওতায় পড়ে, সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। এর আগে সকালে কন্সালটেশন সভার সূচনা বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান বলেন, সাইবার সুরক্ষা সংশোধন আইন চূড়ান্ত করার আগে তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মতামত প্রকাশের সুরক্ষার স্বার্থে গণমাধ্যমের সাথে সরাসরি সংলাপ ও মতামত নেওয়া অপরিহার্য। এজন্যই আমরা গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করছি। তিনি বলেন, 'আপনারাই সবচেয়ে ভালো জানেন একটি আইনের ভাষা মাঠপর্যায়ে কীভাবে কাজ করে এবং কোথায় অস্পষ্টতা তৈরি হতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাইবার সুরক্ষা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা- এই দুটি লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক হওয়া উচিত।'

গণমাধ্যম সম্পাদকদের আশ্বস্ত করে মন্ত্রী বলেন, 'আমরা কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই আইন সংশোধন করছি না। প্রিন্ট মিডিয়ার এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। আইনের কোথায় অস্পষ্টতা বা জটিলতা আছে, আপনারা মুক্তমনে পরামর্শ দিন। আমরা তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।'

কন্সালটেশন সভায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাইবার সিকিউরিটি আইনের সংশোধন প্রয়োজন। আইনটি যেন অপব্যবহার না হয় সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। মন্ত্রী বলেন, 'বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক দেশে মোট অপরাধের ৪৪ শতাংশই এখন সাইবার স্পেসে সংঘটিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও অনলাইন জালিয়াতি, সেক্সটোরশন, নারীদের ব্ল্যাকমেইলিং এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো অপরাধ প্রতিরোধে একটি যুগোপযোগী আইনের বিকল্প নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করে যেন আইনটি পরিমার্জন করা হয়, যাতে এর কোনো অপব্যবহার বা বিতর্ক সৃষ্টি না হয়।' সভায় অংশ নিয়ে আরও বক্তব্য রাখেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা। কন্সালটেশন সভায় মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী। তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে প্রণীত নিপীড়নমূলক আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল ও সংশোধন করে বর্তমান সরকার যে সাইবার সুরক্ষা আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে, তা একটি ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক অগ্রগতি।