কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছেই

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম জলপথ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। হু হু করে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। এতে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছে সীমিত আয়ের মানুষ। সরকার নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ও সহনীয় রাখতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশব্যাপী নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবুও স্বত্তি ফিরছে না বাজারে। অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ব্যে ব্যর্থ হচ্ছে সব উদ্যোগ। ডিম, তেল, আটা, চিনির দাম বাড়লেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল কাঁচাবাজারে। তবে বৃষ্টির কারণে আবারও সবজির দাম বেড়েছে। একমাত্র পেঁপে ছাড়া বাকি সবজির দাম বেড়েছে। বেগুন, বরবটি, করলা, টমেটো এবং গাজরের দাম সবচেয়ে বেশি। ১০০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এসব সবজি। ফলে বাজারে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। এদিন রাজধানীর কমলাপুর কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতি কেজি পটোল বিক্রি হচ্ছে— ৮০ টাকা, বরবটি প্রতি কেজি ১২০ টাকা, ঝিঙা, ধন্দুল, চিচিঙ্গা প্রতি কেজি ৮০ টাকা, পেঁপে প্রতি কেজি ৩০ টাকা, গোল বেগুন প্রতি কেজি ১৪০ টাকা ও লম্বা বেগুন প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, শসা প্রতি কেজি ৮০ টাকা, টমেটো প্রতি কেজি ১০০ টাকা, গাজর প্রতি কেজি ১৪০ টাকা, কচু প্রতি কেজি ৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৬০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৬০ টাকা, ঢ্যাঁড়স প্রতি কেজি ৬০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং কাঁচাকলা প্রতি হালি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সবজির পাশাপাশি শাকের দামও বাড়তি। প্রতি আঁটি লাউ শাক বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা, লাল শাক ২০ টাকা, মুলা শাক ৩০ টাকা, কলমি শাক ২০ টাকা, আলু শাক ২৫ থেকে ৩০ টাকা, পুঁইশাক ৩০ থেকে ৪০ টাকা এবং পাট শাক ২০ টাকায়। এছাড়া সরিষা শাক ৩০ টাকা, ধনেপাতা ২০ থেকে ৩০ টাকা এবং ডাঁটা শাক ২০ থেকে ৩০ টাকা আঁটি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। ডিম ও মুরগির দাম আগের মতোই চড়া। বাজারে সাইজভেদে এক ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে। এক মাসের বেশি সময় ধরে বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে ডিম। আগে এক ডজন ডিমের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আগে এর দাম ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা।

মাছের বাজারে গিয়ে দেখা গেছে. প্রতি কেজি তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা এবং রুই-কাতলা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা এবং পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে।

ইলিশ মাছ তো এখন অনেকটাই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধ্যের বাইরে। বাজারে বড় ইলিশের দাম আকারভেদে কেজিপ্রতি ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। মাঝারি আকারের ইলিশও বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। জাটকা কিনতে গুনতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এদিকে দাম বাড়ানোর পরও বাজারে স্বাভাবিক হয়নি সয়াবিন তেলের সরবরাহ। রাজধানীর অনেক মুদি দোকানেই মিলছে না পর্যাপ্ত বোতলজাত সয়াবিন তেল। বিক্রেতারা জানান অর্ডার দিলেও তেল দেয় না কোম্পানি। দোকানে কোনো সয়াবিন তেল নেই। তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন অনেক ক্রেতা।

সম্প্রতি সরকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়ানোর অনুমোদন দেয়। ব্যবসায়ীরা ১০ টাকা বাড়ানোর দাবি করলেও সরকার ৫ টাকা বাড়ানোর অনুমতি দেয়। এরপর গত ২ সেপ্টেম্বর কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ১৯৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করে। এর মধ্যেই বেড়েছে আটা ও ময়দার দাম। আগে প্রতি কেজি খোলা ময়দা ৬০ থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও এখন তা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। প্যাকেটজাত ময়দা প্রতি কেজি এখন ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও এর দাম ছিল ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা।

সরকারের উদ্যোগ : নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সহনীয় পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশব্যাপী নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলে আগেই জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি জানান, বাজারে পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ ও মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে 'বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন'-এর মাধ্যমে সিন্ডিকেট, কার্টেল ও যোগসাজশমূলক অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

জনস্বার্থে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ এবং দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে সরকারের এসব বাজার মনিটরিং, তদারকি ও তড়িৎ আইনি কার্যক্রম ভবিষ্যতেও প্রয়োজন অনুযায়ী অব্যাহত ও অধিকতর জোরদার করা হবে বলে পুনর্ব্যক্ত করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

কলা ছাড়া সব ফলের দাম লাগামহীন : রাজধানীর বাজারে বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের ফলের দাম। গত সপ্তাহের তুলনায় অধিকাংশ ফলে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। তবে ব্যতিক্রম ফল কলার দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। সরেজমিনে রাজধানীর নিউ মার্কেট বাজার ঘুরে দেখা যায়, আপেল, মাল্টা, কমলা, আঙুর, ডালিমসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফলের দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে। ফলভেদে কেজিতে ৫, ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ার কথা জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

বিক্রেতারা জানান, ফলের দাম ওঠানামার পেছনে সরবরাহ পরিস্থিতি, পরিবহন ব্যয়, সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ খরচসহ বিভিন্ন বিষয় কাজ করছে। আমদানি করা ফলের ক্ষেত্রে আমদানি-সংক্রান্ত ব্যয় ও সরবরাহের পরিবর্তনের প্রভাবও খুচরা বাজারে পড়ছে।