দাফন নাকি দাহ
ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা-বাবার টানাটানিতে হিমঘরে লাশ
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লালকে (৩২) এখনও দাফন কিংবা দাহ করা হয়নি। তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা-বাবার মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় মারা যাওয়ার ছয় দিন পরও তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে আছে। হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা শুভকে ইসলামি রীতিতে দাফন করতে চান মা, স্ত্রী ও ভাই। কিন্তু বাবা চান হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্য করতে। শুভর মৃত্যুর পরপরই মা ও স্ত্রী দাফন করতে চাইলে বাধা দেন বাবা। দাফন কিংবা দাহকাজ নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে স্ত্রীর পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। পরে গত বৃহস্পতিবার ইসলামি রীতিতে দাফনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, দাফন নিয়ে মা ও বাবার মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে রাখা হয়েছে। মা ও ভাই উচ্চ আদালতে আবেদন করলে ইসলামি রীতিতে লাশ দাফনের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনের সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুভর মা পার্বতী রানী দাস ও বাবা হরি চন্দ্র দাসের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ২০০৩ সালে তিন সন্তানকে (দুই ছেলে ও এক মেয়ে) নিয়ে পার্বতী রানী হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর তার নাম হয় আয়েশা বেগম। দুই ছেলের নামও পরিবর্তন করা হয়। শুভর নতুন নাম রাখা হয় মো. বিল্লাল এবং তার ছোট ভাই সুজনের নাম হয় ইব্রাহিম। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) শুভ চন্দ্র দাস নাম পরিবর্তন করা হয়নি।
শুভর ভাই ইব্রাহিম বলেন, ধর্মান্তরের পর থেকেই তারা মুসলিম পরিচয়ে জীবনযাপন করে আসছেন। ছোটবেলায় শুভ মাদ্রাসায় পড়েছেন। এখন বাবা হিন্দুধর্মের অনুসারী দাবি করে লাশ দাফনে বাধা দিচ্ছেন। শুভ মুসলিম পরিচয়েই বড় হয়েছেন বলে দাবি পরিবারের। প্রায় আট বছর আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মুসলিম তরুণী জ্যোতি আক্তারকে বিয়ে করেন। কাবিননামার মাধ্যমে তাদের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে সুমাইয়া আক্তার নামে দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে। তারা নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার ভূঁইগড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।
শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তার বলেন, তার স্বামী জীবিত থাকতে বলে গেছেন, মারা গেলে মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করতে। কিন্তু তার শ্বশুর পুলিশ পাঠিয়ে মাসদাইর কবরস্থান থেকে লাশ নিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, 'আমার স্বামী মরে গিয়েও শান্তি পাইতাছে না। ওনারা তাকে কষ্ট দিতাছে। আমরা চাই, ইসলাম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার লাশ দাফন করা হোক।' তবে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাসের অবস্থান ভিন্ন। তার দাবি, শুভ হিন্দু পরিবারে জন্মেছেন। তাই হিন্দু ধর্মীয় রীতিতেই তিনি ছেলের শেষকৃত্য করতে চান। পরিবারের তথ্যমতে, শুভর জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম পরিবর্তন করা হয়নি। তার বাবা নিজে জাতীয় পরিচয়পত্রে সৎমায়ের নাম ব্যবহার করেছেন বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। লাশ নিয়ে বিরোধ শুরু হওয়ার পর প্রথমে শুভর লাশ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অ্যাম্বুলেন্সের ফ্রিজে রাখা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) মফিজুল ইসলাম বলেন, শুভর মায়ের আবেদনের পর লাশ দাফনের জন্য কবরস্থানে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শুভর বাবা আইনজীবীর মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্যের জন্য লাশ চেয়ে আবেদন করেন। হস্তান্তরের আগপর্যন্ত লাশ ঢাকা মেডিকেলের হিমঘরে রাখার আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। তিনি বলেন, শুভর মা ও ভাই উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার বিচারপতি ইকবাল কবির ও বিচারপতি সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ শুভকে ইসলাম ধর্মীয় রীতিতে দাফন করার আদেশ দেন।
