ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় সড়কে বিশৃঙ্খলা

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলার শহরগুলোর মূল সড়ক থেকে শুরু করে অলি-গলির সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এতে অলি-গলি ছাড়িয়ে সেগুলো মূল সড়কে চলে আসায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজটও। মূল সড়কে অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচলে বিপদে পড়ছে দ্রুতগতির যানবাহনগুলো। এতে প্রতিদিনই ছোটখাট দুর্ঘটনাও ঘটছে। ট্রাফিক ও কমিউনিটি পুলিশের তৎপরতাও এসব অটোরিকশার খামখেয়ালিপনা থামাতে পারছে না। এতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের সংকট দেখা দিয়েছে।

সরকার বর্তমানে হিসেব করেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসেব অনুযায়ী এই সংখ্যা ৬০ লাখের বেশি, যার মধ্যে ১০ থেকে ১২ লাখ রয়েছে শুধু ঢাকাতেই। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ঢাকা শহরকে আটটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে ভাগ করে রংভিত্তিক জোন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। সেই সাথে ভুয়া নিবন্ধন ঠেকাতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করা এবং অননুমোদিত প্রস্তুতকারক ও ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং স্টেশনের বিরুদ্ধে অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই অবৈধ চার্জিং স্টেশনগুলোর কারণে সরকারের বার্ষিক প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

দুর্ঘটনা কমাতে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও, শহরের রাস্তাগুলোতে এখনও এগুলো অবাধে চলছে। আর লাখ লাখ চালকের জীবিকা সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে সরকারের পক্ষে এদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো ক্র্যাকডাউন বা অভিযানে যাওয়া এখনও অসম্ভাব্য বলেই মনে হয়। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের মে মাসে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল। ১৫ মে তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কর্তৃপক্ষকে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেন। চালকরা সে সময় সড়ক অবরোধ করে সহিংস প্রতিক্রিয়া জানান।

১৯ মে বিক্ষোভের কারণে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা অচল হয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা অন্তত চারটি বাসে ভাঙচুর চালায় এবং কালশীতে একটি পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের সেল নিক্ষেপ করে। এসব সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। এই নিষেধাজ্ঞা মাত্র কয়েকদিন স্থায়ী হয়। ২০ মে ওবায়দুল কাদের ঘোষণা করেন, নিম্ন আয়ের চালকদের কষ্টের কথা বিবেচনা করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় এসব যানবাহন চলাচলের অনুমতি দিয়েছেন। তবে মহাসড়কগুলোতে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়।

জুলাই অভ্যুত্থানের পরও ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট তিন দিনের মধ্যে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেন। চালকগণ আবারও সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। ২৫ নভেম্বর সরকারের একটি আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ ওই আদেশের ওপর এক মাসের জন্য 'স্থিতাবস্থা' বজায় রাখার নির্দেশ দেন। ফলে যানবাহনগুলো আবারও রাস্তায় ফিরে আসে। বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)-এর কার্যনির্বাহী কমিটির পরিচালক মোহাম্মদ সুবাইল বিন আলম বলেন, 'নিয়ন্ত্রণ শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, কারণ প্রতিটি পদক্ষেপেই সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল এবং উচ্ছেদকেই নিয়ন্ত্রণ বলে ভুল করা হয়েছিল। যে যানবাহনটি এর মধ্যেই একটি বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়েছে, তাকে আপনি চাইলেই এক ঘোষণায় নিষিদ্ধ করতে পারেন না।'

রাষ্ট্র 'লাস্ট-মাইল' পরিবহনকে গুরুত্ব দেয়নি

ব্যাটারিচালিত রিকশার আধিক্য নিয়ে তর্কের সময় সমালোচকরা প্রায়শই ভুলে যান, কেন এগুলো শুরুতেই এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এগুলো মূলত পরিবহনের শূন্যতা পূরণ করেছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গ্যারেজ মালিকরা সুযোগটি কাজে লাগান এবং রাস্তায় এসব যানবাহনের প্লাবন ঘটান। বাসগুলো সরু আবাসিক রাস্তায় ঢোকে না। আবার, মেট্রো স্টেশনগুলো যাত্রীদের সরাসরি বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয় না। সাধারণত স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো প্রায়শই বেশ ব্যয়বহুল।

অন্যদিকে প্যাডেলচালিত রিকশাগুলো এই শহরের গতি ও চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত ধীরগতির। আর ঢাকায় হেঁটে চলাচল করা একটা ভালো বুদ্ধি বলে যারা মনে করেন, তারা নির্ঘাত সকাল ১১টার আগে বা বিকেল ৫টার পরে নিউ মার্কেট, গুলিস্তান, মিরপুর-১০ কিংবা ফার্মগেটের ফুটপাত দিয়ে কখনও হেঁটে দেখেননি। ব্যাটারিচালিত রিকশা যাত্রীদের দোরগোড়াতেই সহজলভ্য এবং কম খরচে যাতায়াতের সুবিধা দেয়। গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিরোজ আহমেদ ফিরোজ আহমেদ বলেন, 'পরিবহনের একটি সামাজিক চাহিদা রয়েছে, আর সেই চাহিদা পূরণের দায়িত্ব কার? সরকার এবং সিটি কর্পোরেশনের। যখন তারা আনুষ্ঠানিক পরিবহন ব্যবস্থা সরবরাহে ব্যর্থ হয়, তখন অনানুষ্ঠানিক রূপের পরিবহন গড়ে ওঠা অনিবার্য।' আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে দমন-পীড়ন, 'অটোরিকশা নিষিদ্ধ করো' বলে চিৎকার করা কিংবা চালকদের মুখোমুখি হতে সোহানী শিফার ভারতীয় সিনেমার রাগী নায়িকাসুলভ স্টান্ট-কোনোটি দিয়েই এদের নির্মূল করা যাচ্ছে না।

ফিরোজ আহমেদ আরও বলেন, 'সরকার যদি স্বল্প দূরত্ব ও নির্দিষ্ট গন্তব্যের যাত্রার জন্য পর্যাপ্ত পরিবহন সরবরাহ না করে, তবে মানুষ অন্য কোনো পথ খুঁজে নেবেই। কেবল আইনি প্রয়োগ বা পুলিশি কড়াকড়ি দিয়ে আপনি এটি বন্ধ করতে পারেন না। প্রথম কাজ হলো বিকল্প ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করা।' তিনি আরও বলেন, থাইল্যান্ডের উদাহরণটি এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে। ১০ বা ১৫ বছর আগে ব্যাংককে অনেক বেশি রিকশা ছিল, কিন্তু অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে সেগুলোর সংখ্যা কমে এসেছে। ফলে এধরনের পরিবহন ব্যবস্থাগুলো ধীরে ধীরে প্রান্তিক পর্যায়ে চলে গেছে।

লাখ লাখ যানবাহন, অথচ কোনো জবাবদিহিমূলক মালিক নেই। অটোরিকশা অর্থনীতি এখন পার্টস আমদানিকারক, অ্যাসেম্বলি ওয়ার্কশপ, মেকানিক, যানবাহনের মালিক, ফ্ল্যাট অপারেটর, গ্যারেজ, চার্জিং ব্যবসা, চালক, স্থানীয় নেতা এবং প্রভাবশালী বা চাদাঁবাজি বলয়ের এক দীর্ঘ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ নিয়ন্ত্রণমূলক বা আইনি প্রস্তাবনাগুলো সাধারণত শুরু হয় এই নেটওয়ার্কের একদম শেষ প্রান্তে থাকা চালককে দিয়ে। যেহেতু যানবাহনগুলোর সাধারণত কোনো বিআরটিএ নিবন্ধন, সনাক্তকরণ নম্বর বা নির্ভরযোগ্য মালিকানার নথি নেই, তাই পুলিশ প্রচলিত ট্রাফিক জরিমানা ইস্যু করতে পারে না। কর্তৃপক্ষ এগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারে, তবে লাখ লাখ যানবাহনের এই বহরের জন্য তাদের পর্যাপ্ত ডাম্পিং স্পেস নেই। আজ হয়তো একজন চালককে সরিয়ে দেওয়া হলো, কিন্তু কালকেই তার জায়গায় অন্য একজন চলে আসে।

এমনকি লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ কে হবে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়ে গেছে। বিআরটিএ জানিয়েছে, এই দায়িত্ব তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনগুলো রিকশার লাইসেন্স দেওয়ার এখতিয়ার দাবি করছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২০২৫ সালে একটি 'ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার ম্যানেজমেন্ট পলিসি' বা 'ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা'র খসড়া তৈরি করে। তবে বিআরটিএ-র আপত্তির মুখে পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার বিভাগ আলাদা নির্দেশিকা তৈরি করে। সুবাইল বিন আলম বলেন, এ সমন্বয়হীনতা যেন বিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই ব্যর্থতা কারিগরি কোনো বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক—এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কায়েমি স্বার্থের বিষয়।