জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী শেভরন
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি শেভরন। বিশেষ করে দেশে বিদ্যমান ও পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উন্নয়নে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে আলোচনা করেছেন শেভরনের বেস অ্যাসেটস ও উদীয়মান দেশবিষয়ক প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের লা রোসার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। গতকাল রোববার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, গ্যাসের সরবরাহ ও উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বৈঠকে দেশের বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে শেভরনের বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে আরও গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়। দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন উৎস অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে শেভরনের এ আগ্রহকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে গ্যাসের চাহিদা থাকায় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধরে রাখা এবং নতুন গ্যাসের উৎস খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে গ্যাসের সরবরাহ বাড়লে আমদানিনির্ভরতার চাপও কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে শেভরনের মতো আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আগ্রহকে জ্বালানি খাতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সৌজন্য সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শেভরনের প্রতিনিধি দলের আলোচনায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো উঠে আসে। বিদ্যমান সম্পদের উন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়। তবে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগের পরিমাণ বা প্রকল্পের বিস্তারিত ঘোষণা দেওয়া হয়নি। শেভরনের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন প্রতিষ্ঠানটির বেস অ্যাসেটস ও উদীয়মান দেশবিষয়ক প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের লা রোসা। বৈঠকে শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ংসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে কি না, তা মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দেশের অনাবিষ্কৃত বা সম্ভাবনাময় এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো গেলে ভবিষ্যতে নতুন গ্যাসের মজুত আবিষ্কারের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
শেভরনের বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহের ফলে এসব সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে। ফলে বিদ্যমান গ্যাসসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং নতুন সম্পদ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে তাদের সম্ভাব্য বিনিয়োগ জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে নীতিগত স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। বড় ধরনের জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে উৎপাদন সম্ভাবনা, বাণিজ্যিক কার্যকারিতা, অবকাঠামো, গ্যাসের বাজার এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে থাকে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো। এ কারণে শেভরনের আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে পরবর্তী সময়ে আরও আলোচনা ও কারিগরি মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প খাতে উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থিতিশীল রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো গেলে এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়ন ও নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানোকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। রোববারের বৈঠকে শেভরনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আরও সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টি সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগের আলোচনা ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
