কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা বাড়াতে প্রকল্প উঠছে একনেকে
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের সাড়ে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে বাড়ছে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি। মা, নবজাতক ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি এসব কেন্দ্রে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ অসংক্রামক রোগ শনাক্ত, পরামর্শ ও রোগীকে উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। এ জন্য ৩৯৬ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ৩৯৬ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে 'হেলথ সিস্টেম স্ট্রেনদেনিং থ্রু এমএনসিএইচ সার্ভিসেস ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড এনসিডিস কন্ট্রোল' শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত ধরা হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। আগামী বুধবার পরিকল্পনা কমিশনের একনেকে পাঠানোর সুপারিশ করেছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় দেশের আট বিভাগ ও ৬৪ জেলার ৩০টি জেলা হাসপাতাল, ৪৩০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ১৪ হাজার ৫০০টি কমিউনিটি ক্লিনিককে কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৭৫ কোটি ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। বাকি ৩২১ কোটি ৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার ঋণ থেকে আসবে।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। বিশেষ করে মা, নবজাতক ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার মান ও পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পর্যায় থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত একটি কার্যকর সেবা ও রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিকে মা, নবজাতক ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর করা হবে। শিশু ও নবজাতকের অসুস্থতা ব্যবস্থাপনা, শিশুর যথাযথ খাবার নিশ্চিত করা এবং শিশুর বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণের মতো সেবাগুলো জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি গর্ভবতী নারী, নবজাতক ও শিশুদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সেখান থেকে জেলা হাসপাতালে রোগী পাঠানোর ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা হবে। কোনো রোগীর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে যাতে তাকে দ্রুত উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো যায়, সে জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রেও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা, পরামর্শ, রোগীকে উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো এবং পরবর্তী সময়ে রোগীর খোঁজ রাখার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পের আওতায় ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত রোগী পাঠানোর একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, সেবা নিতে আসা রোগীদের একটি অংশকে প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো হবে। এ ছাড়া ৪৩০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৩০টি জেলা হাসপাতালে অসংক্রামক রোগের জন্য নির্ধারিত কর্নারগুলোকে কার্যকর ও আধুনিক করা হবে। এসব কেন্দ্রে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং, চিকিৎসা ও ফলোআপ সেবা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা সচিব এসএম শাকিল আকতার বলেন, মা, নবজাতক ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করাই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে এসব রোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে অসুস্থতা ও মৃত্যুর হার কমানোর পাশাপাশি মানুষের দোরগোড়ায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মান ও পরিধি বাড়ানো হবে। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে মা, নবজাতক ও শিশুদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ সম্ভাব্য অসংক্রামক রোগীদের প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হবে। একই সঙ্গে মা, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্যের জরুরি ও জটিল রোগীদের দ্রুত উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত এই রেফারেল ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।পরিকল্পনা কমিশন বলছে, দেশে বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের কারণ অসংক্রামক রোগ। এর মধ্যে শুধু হৃদ্?রোগের কারণে মৃত্যুর হার প্রায় ৩৪ শতাংশ। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, তামাক ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
২০২২ সালের জাতীয় স্টেপস জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে বয়স-সমন্বিত ডায়াবেটিসের হার ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। একই বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষের বাড়ির কাছাকাছি পর্যায়ে এসব রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই বাস্তবতায় কমিউনিটি ক্লিনিককে অসংক্রামক রোগ শনাক্তকরণ ও রেফারেল ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।
মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও কমিউনিটি পর্যায়ে সেবার মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ৭০-এর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। একই সময়ের মধ্যে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে নবজাতকের মৃত্যুহার ১২-এর নিচে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ২৫-এর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও রয়েছে। এসব লক্ষ্যে পৌঁছাতে কমিউনিটি পর্যায়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় শুধু অবকাঠামো বা চিকিৎসার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের ওপরও বড় ধরনের ব্যয় রাখা হয়েছে। স্থানীয় প্রশিক্ষণের জন্য ১০৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ২৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ অর্থে ৫ হাজার ২৫৪টি প্রশিক্ষণ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি প্রশিক্ষণের জন্য ৩ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারসামগ্রী এবং অন্যান্য সরবরাহ নিশ্চিত করতেও বড় অঙ্কের অর্থ রাখা হয়েছে। এ খাতে ১৪৩ কোটি ২১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশের বেশি এই খাতে ব্যয় হবে। এসব সামগ্রী ১৪ হাজার ৯৬০টি কেন্দ্রের জন্য সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গবেষণার জন্য রাখা হয়েছে ৮ কোটি ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ অর্থে পাঁচটি গবেষণা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়াতেও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে দল ও সহায়ক দল গঠন এবং বিভিন্ন অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় সেবা কার্যক্রমের তদারকি ও পরিবীক্ষণ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হবে। মাঠপর্যায়ে কী ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং রোগীকে প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৩৯৬ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২১৭ কোটি ৩১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। পরবর্তী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ব্যয় হবে ১৯৭ কোটি ৪৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে কাছের স্তর কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত মা, নবজাতক ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগ দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে উচ্চতর কেন্দ্রে পাঠানোর সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছে কমিশনের কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা বলছেন, ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সরবরাহ, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য বাড়ির কাছাকাছি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বিস্তৃত হবে। মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণকে একই প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোকে কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়েই প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানান, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে সরকার ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ০১ শতাংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। নতুন বাজেটকে সরকার শুধু অর্থ বরাদ্দ হিসেবে দেখছে না, বরং এটি পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য সংস্কার কর্মপরিকল্পনার প্রথম ধাপ। রোগ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকেও এ পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, বাজেটের বড় অংশ উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল সম্প্রসারণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলায় ব্যয় করা হবে।
