দেশে গ্যাসের নতুন কূপ

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে খনন করা হচ্ছে নতুন তিনটি কূপ। যার একটি দেশের প্রথম এবং সবচেয়ে গভীর অনুসন্ধান কূপ। নতুন এসব কূপ থেকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অন্তত ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের আশা করছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি চলমান জ্বালানি সংকট নিরসনেও রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নন্দনপুরে খনন চলছে দেশের প্রথম ও সবচেয়ে গভীর অনুসন্ধান এই গ্যাস কূপের। এর মাধ্যমে প্রথাগত গ্যাস অনুসন্ধানের সীমা পেরিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করছে গভীর গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন অধ্যায়ে। জ্বালানি সংকটের মাঝে যা ছড়াচ্ছে আশার আলো। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের এই কূপ এলাকায় প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত থাকার আশা সংশ্লিষ্টদের।

দেশের সবচেয়ে উচ্চচাপ এবং উচ্চতাপ সম্পন্ন ৩১ নম্বর কূপটি ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় খনন শুরু হয় চলতি বছরের গত ১৯ এপ্রিলে (এর আগে ১৯৬৯ সালে সর্বোচ্চ ৩৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল)। আর এবার এরইমধ্যে ৪ হাজার ৬৩৭ মিটার খনন হয়েছে। ২০২৬ চলতি বছরেই কূপটির খনন সম্পন্ন (৫ হাজার ৬০০ মিটার) করে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার আশা বিজিএফসিএলের।

বর্তমানে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৩টি কূপে প্রতিদিন গড়ে ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীর থেকে। তবে বিদ্যমান কূপগুলোতে গ্যাসের মজুত এবং চাপ কমার ফলে উৎপাদনও কমেছে। এ অবস্থায় তিতাসের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ২৯, ৩০ এবং ৩১ নম্বর কূপের খনন প্রকল্প নিয়েছে বিজিএফসিএল। এর মধ্যে ২৯ ও ৩১ নম্বর কূপের খনন কাজ চলমান রয়েছে। এ দুই কূপের খনন শেষে ৩০ নম্বর কূপের খনন শুরু হবে।

এ বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের প্রকল্প পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব বলেন, আশা করছি, আমরা যদি খনন কাজটা সাকসেসফুলি কমপ্লিট করতে পারি, তাহলে অন এভারেজ এই তিনটা কূপ থেকে হয়তো ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস দেওয়া সম্ভব হবে। ২৯ নম্বর কূপটা খনন সম্পন্ন হলে ৩০ নম্বর কূপটা আমরা খননে যাব। একই রিগ দিয়ে ৩০ নম্বর কূপ খনন হবে।

তিনি আরও বলেন, ২৯ নম্বর কূপটা যেহেতু ২৮৬০ মিটার খনন হয়েছে, এটা যদি কোনো কারিগরি জটিলতা না থাকে হয়তো আগামী দুই মাসের মধ্যে হয়ে যাবে। এবং ওইটা শেষ হয়ে গেলে তারপরে হয়তো ৩০ হবে। আর আমার ৩১ নম্বর কূপ আরও তিন থেকে চার মাস লাগবে। কারণ এটার সঙ্গে যেহেতু অনেক গভীর এবং হাই প্রেশার টেম্পারেচার খননকালীন সময়ে কিছু জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছি বা ভবিষ্যতে আবার কী হবে এটাও বলা যায় না। তবে আমাদের প্রেডিকশন, এ তিনটা কূপ হয়তো আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাবে।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, দেখেন তিতাসে এ পর্যন্ত আমরা ৩৭০০ মিটার পর্যন্ত খনন করেছি। কিন্তু ৩৭০০ মিটারের নিচে কী আছে এটা আমরা জানি না। বাট আমরা এই ৩৭০০ মিটার যখন ১৯৬৯ সালে এই ৩৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত যায়, তখন কিন্তু ৩৬০০ মিটারে একটা হাই প্রেশার জোন এনকাউন্টার করে। এই কারণে কিন্তু আমাদের নিচে যাওয়া হয় নাই। এখন দেশে যেহেতু একটা জ্বালানি সংকট এবং আমাদের মন্ত্রণালয় বলেন, পেট্রোবাংলা বলেন এবং আমাদের হায়ার অথরিটি যারা আছে, তারা আসলে গভীরতম স্তরে কী আছে এটা আমাদেরও আইডেন্টিফাই করার একটা বিষয় আছে।

?সেই কারণে আমরা এই কূপটার বিশেষত্ব হলো, এটা হচ্ছে একটা গভীর অনুসন্ধান কূপ এবং যেটা হাই প্রেশার হাই টেম্পারেচার বিভিন্ন জোন অতিক্রম করে যাবে এবং তিতাসের ৩৭০০ মিটার এর থেকে ৫৬০০ মিটার গভীরে আরও কোনো গ্যাসের উপস্থিতি আছে কিনা এটা জানা যাবে। তো এই মুহূর্তে আমাদের যে টার্গেটটা আছে, মানে সিসমিক স্টাডির ওপরে ভিত্তি করে যে এখানে ২ টিসিএফ এর মতো গ্যাস থাকতে পারে। এই উদ্দেশ্যেই আমাদের এই খননটা সম্পন্ন করা।

তিতাসের পাশাপাশি বিজিএফসিএল পরিচালিত অন্য গ্যাসক্ষেত্রগুলোতেও উৎপাদন বাড়াতে বন্ধ কূপ ওয়ার্কওভার এবং নতুন আরও কূপ খনন প্রকল্প গ্রহণের কথা জানান বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

খনন বিষয়ে বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল প্রামানিক বলেন, আশা করছি আগামী ছয় মাসে এই তিনটা কূপ থেকে আমরা প্রোডাকশন জাতীয় গ্রিডে দিতে পারবো। ?এটা আমাদের চাহিদার তুলনায় এই গ্যাস যে খুব বেশি সেটা বলা যাবে না। তবে অবশ্যই এটা আমাদের দেশের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমরা এই পরিমাণ গ্যাস এলএনজি থেকে কাট করতে পারব।

এলএনজি যে বেশি দামে কেনা হচ্ছে সেখান থেকে সরকার একটা স্বস্তির জায়গায় যাবে। কারণ আমাদের যে গ্যাস সরকার এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছে সেটা অলমোস্ট হচ্ছে ১ ইউনিট গ্যাসে ১ টাকা করে মূল্যেই কিন্তু আমাদের এই ন্যাশনাল উৎপাদন কোম্পানির কাছ থেকে নিয়ে যাচ্ছে সরকার।

তিনি আরও জানান, যেটা এলএনজি ফর্মে আনতে গেলে প্রায় ৭০ টাকা ৮০ টাকা কিন্তু বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হচ্ছে। ?অনেক ফরেন কারেন্সি আমাদের এখানে লস হয়ে যাচ্ছে। তো সেই ফরেন কারেন্সি সেভ হবে। ৪৫ মিলিয়ন গ্যাস কিন্তু আর আমাদের বাইরে থেকে আনতে হবে না।

১৯৬২ সালে তিতাস গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি। এরপর ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয় দেশের সবচেয়ে বড় এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে।