দুই তরুণের উদ্যোগ

দেশের প্রথম কমিউনিটিভিত্তিক কৃষি-পর্যটন প্রকল্প

শুক্রবারের বিশেষ খবর

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  গাজী মুনছুর আজিজ

বগুড়ার কাহালু উপজেলার বাগইল গ্রাম। বছর চারেক আগেও গুগল ম্যাপে এ গ্রামের নাম খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। অথচ সেই গ্রামেই ৩০ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠছে এক ব্যতিক্রমী কৃষি-পর্যটন প্রকল্প। এর মালিক কোনো একক ব্যক্তি বা কোম্পানি নয়, মালিক হাজার জন মানুষ। সাফ-কবলা দলিলের মাধ্যমে জমিসহ প্রত্যেকেই এর আইনি মালিক। প্রতিষ্ঠানটির নাম সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ। উদ্যোক্তাদের দাবি, এটি বাংলাদেশের প্রথম কমিউনিটিভিত্তিক এগ্রো ট্যুরিজম প্রকল্প। যে গ্রাম একসময় ছিল অনেকের কাছে অচেনা, সেই গ্রামই এখন হয়ে উঠছে হাজার মানুষের স্বপ্নের ঠিকানা।

কৃষিভিত্তিক পর্যটনের মূল ভাবনা : খামারে থাকা, নিজের হাতে ফসল তোলা, গ্রামীণ জীবন উপভোগের সুযোগ— এসবের সমন্বয়ই কৃষিভিত্তিক পর্যটন। উদ্যোক্তারা জানান, বিশ্বজুড়ে এ খাতের বাজার এখন প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলারের, বাড়ছে বছরে ১১ শতাংশ হারে। ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনাম হয়ে সেই ঢেউ এবার বাংলাদেশেও পৌঁছেছে। আর এর সূচনা হয়েছে বগুড়ার বাগইল গ্রামে।

করপোরেট জীবন ছেড়ে মাটির টানে : উদ্যোগটির পেছনে রয়েছেন দুই স্বপ্নদেখা মানুষ। ব্যবস্থাপনা পরিচালক জোবায়ের ইসলাম ঢাকায় ১৯ বছরের প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার ছেড়ে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সপরিবারে চলে আসেন বাগইল গ্রামে। গ্রামবাসী তখন তাকে ভেবেছিলেন 'তিন মাসের মেহমান'। আর চেয়ারম্যান মো. তাসদীখ হাবীব ২২ বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নিয়ে সামলাচ্ছেন প্রকল্পের নকশা ও কৌশল। একজন মাঠে, অন্যজন পরিকল্পনায়।

জোবায়ের ইসলাম বলেন, গ্রামের মানুষ প্রথমে বিশ্বাসই করেননি। সবাই ভাবত, লোকসান করে শহরে ফিরে যাব। কিন্তু আমি বলতাম, একদিন শহরের মানুষই এ গ্রামে বেড়াতে আসবে, কৃষক পাবেন ন্যায্য দাম, গ্রামটাই হবে গন্তব্য। আজ সেটাই সত্যি হতে চলেছে। খামারের সাম্প্রতিক চিত্র : সম্প্রতি খামার ঘুরে দেখা যায়, গোয়ালে চলছে শতাধিক গরুর মোটাতাজাকরণ, পাশের শেডে ছাগল ও দুম্বার প্রজনন। সারি সারি ট্যাংকে আধুনিক বটম-ক্লিন পদ্ধতিতে মাছ চাষের সফল পরীক্ষামূলক কার্যক্রম, পলিনেট হাউসে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন, ছাদে সৌর প্যানেল। অতিথিশালায় শহর থেকে আসা অতিথিদের কেউ মাছ ধরছেন, কেউ ধানখেতের আলপথে হাঁটছেন, শিশুরা ছুটছে খালি পায়ে। সন্ধ্যায় বসে স্থানীয় বাউল আমিনুল বয়াতির গানের আসর।

পূর্ণাঙ্গ রিসোর্ট চালুর আগেই গত দেড় বছরে এ গ্রামে বেড়াতে এসেছেন দুই হাজারের বেশি অতিথি। তাদের মধ্যে নয় শতাধিক রাত্রিযাপন করেছেন। এসেছেন সাতজন বিদেশি পর্যটকও। তাদের হাত ধরে গ্রামের মানুষের পকেটে এসেছে এক কোটির বেশি টাকা, তাও কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই।

বদলে যাচ্ছে গ্রামের অর্থনীতি : পরিবর্তনের গল্পটা স্পষ্ট হয় রহিমা বেগমের কথায়। মেয়ের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে একদিন দুটি মুরগি বিক্রি করতে এসেছিলেন খামারে। বেড়াতে আসা এক অতিথি ন্যায্য দামে মুরগি দুটি কিনে নেন। আজ তিনি প্রতি মাসে দশ-বারোটি হাঁস-মুরগি বিক্রি করেন অতিথিদের কাছেই। ফাউন্ডেশনের 'সুখের হাসি' প্রকল্পের আওতায় তার মতো ১০ জন নারী এখন স্বাবলম্বী।

প্রতিষ্ঠানের নির্মিত রাস্তায় প্রতিদিন চলাচল করেন প্রায় ৫০০ মানুষ। ১৫টি পরিবার পেয়েছে বিশুদ্ধ পানির নলকূপ। দুটি বিনা মূল্যের চিকিৎসাশিবিরে চিকিৎসা পেয়েছেন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ। খামারে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে ৪০ জনের, যাদের ১৮ জনই স্থানীয়। পরোক্ষভাবে কাজ পেয়েছেন আরও প্রায় ২০০ জন।