সুসংবাদ প্রতিদিন
বিষমুক্ত সবজি চাষে লাভবান কৃষক
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এ.এইচ.এম.আরিফ, কুষ্টিয়া

জমির আইলের চারপাশে নীল জালের বেড়া। ভেতরে বাঁশ ও জালের মাচা। মাচার ওপরে সবুজ লতা। আর নিচে থোকায় থোকায় ঝুলছে তরতাজা করলা। এই করলায় কিন্তু নেই কোনো কীটনাশক বা রাসায়নিক বিষ। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় প্রথমবারের মতো উত্তম কৃষিচর্চা বা গ্যাপ পদ্ধতিতে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে সাড়া ফেলেছেন দুই কৃষক। ফলন ভালো বাজারের দামেও তাদের মুখে হাসি। উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের ধলনগর গ্রামের জমারত আলীর ছেলে দবির উদ্দিন ফারাজী ও মৃত তোয়াজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল বারী তিন বিঘা জমিতে আলিসা জাতের করলা চাষ করেছেন। গত ১০ দিনে তারা ২ হাজার ২০০ কেজি করলা বিক্রি করেছেন। স্থানীয় বাজারে পাইকারি দর ছিল কেজি প্রতি ৪০ থেকে ৫৫ টাকা। এতে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় হয়েছে তাদের। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী দেড় মাসে আরও ৪ হাজার কেজির বেশি করলা বিক্রির আশা করছেন তারা। যার বাজার মূল্য প্রায় আড়াই লক্ষাধিক টাকা। বাজারে বিষমুক্ত এবং বিষযুক্ত সবজির আলাদা বাজার বা হাট নেই। ফলে সমান দামে বিক্রি হওয়ায় লাভবান হতে পারছেন না তারা। তাদের ভাষ্য, গত বছর এই সময়ে প্রতি কেজি করলা প্রায় ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে বর্তমান দাম তার অর্ধেক। গতবারের মতো দাম থাকলে কয়েক লাখ টাকা লাভবান হতেন তারা।
শহর থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরের ধলনগর মাঠে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরো জমি নীল রঙের নেট দিয়ে ঘেরা। পোকা-মাকড় দমনে ব্যবহার করা হয়েছে ফেরোমন ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশক। মাটিতে দেওয়া হয়েছে জৈব সার। একজন পরিচর্যা করছেন খেতে। অপরজন তুলছেন করলা। এ সময় উদ্যোক্তা দবির উদ্দিন বলেন, ?গ্যাপ পদ্ধতিতে চাষ করতে খরচ বেশি। জাল, ফাঁদ, জৈব সার-সবই কিনতে হয়। কিন্তু ফলন ভালো এবং সবজিও স্বাস্থ্যকর। তবে ক্রেতারা এখনও বিষমুক্ত সবজির দাম দিতে চান না।' তাঁর ভাষ্য, তিন বিঘা জমিতে জমি চাষ, বীজ, উপকরণ ও পরিচর্যা বাবদ প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বিপরীতে গত ১০ দিনে প্রায় দুই হাজার ২০০ কেজি করলা উৎপাদন হয়েছে। প্রতি কেজি করলা পাইকারি ৫৫ থেকে ৩৫ টাকা দরে ৬৫-৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
আবহাওয়া ভালো থাকলে আরও চার হাজার ৪০০ কেজি উৎপাদনের প্রত্যাশা তার। দবির উদ্দিন ও আব্দুল বারীর স্বপ্ন, একদিন তাদের এই বিষমুক্ত করলা ঢাকা-কুষ্টিয়ার বড় বাজারে যাবে। ক্রেতারা লেভেল দেখে কিনবেন। দামও পাওয়া যাবে ন্যায্য।আরেক উদ্যোক্তা আব্দুল বারী বলেন, 'বিষমুক্ত এবং বিষযুক্ত সবজির একই বাজার হওয়ায় সঠিক দাম মিলছে না। সমান দামে বিক্রি করে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। আমরা চাই বাজারে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা কর্নার হোক। তাহলে মানুষ বুঝে কিনতে পারবে। আমরাও ন্যায্য দাম পাব।'
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর বিষমুক্ত তিন বিঘাসহ এ উপজেলায় প্রায় ৫২ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০০ টন করলা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকারও বেশি। এখানে আধুনিক ও মালচিং পদ্ধতিতে করলার চাষ করা হচ্ছে। ধলনগর গ্রামের কৃষক উজ্জল চৌধুরী প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে হরেক রকম ফসলের চাষাবাদ করে থাকেন। তিনি জানান, গেল বছর আট কাঠা জমিতে করলা চাষ ছিল তার। প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ করে ৬০ হাজার টাকার করলা বিক্রি করেছিলেন। অল্প খরচে অধিক লাভ হওয়ায় চলতি বছরে তিনি ১০ কাঠা জমিতে করলার চাষ করেছেন। গেল এক সপ্তাহে তিনি ৯০ কেজি করলা বিক্রি করেছেন। ন্যায্যমূল্য পেলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে এ চাষ করবেন তিনি।
একই গ্রামের মোহন শেখ জানান, গত বছর এক বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতি করলা চাষে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। চলতি বছর সমপরিমাণ জমিতে আগাম করলা চাষ করেছিলেন। প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচে তিনি দেড় লাখ টাকার করলা বিক্রি করে ভালো লাভবান হয়েছেন। কৃষি প্রণোদনা পেলে তিনি আগামী বছর মালচিংসহ বিষমুক্ত করলা চাষ করতে চান।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন বলেন, চলতি বছর উপজেলায় ৫২ হেক্টর জমিতে করলা চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৫০০ মেট্রিক টন। বাজার দর হিসাবে যার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি। তিনি আরও বলেন, গ্যাপ পদ্ধতিতে চাষ করা সবজি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ। আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। তবে বাজারজাতকরণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা দরকার। উপজেলা পর্যায়ে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা হাট বসানোর প্রস্তাব আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব। ব্যাপক হারে উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে প্রতিটি হাটে বিষমুক্ত সবজির আলাদা কর্নার বসানোর আশ্বাস দিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার।
