গভীর নিম্নচাপে উত্তাল বঙ্গোপসাগর ঘাটে বসে লোকসান গুনছেন জেলেরা
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
মেঘলা আকাশ, থেমে থেমে বৃষ্টি আর দমকা বাতাস। উত্তাল হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর। সাগরে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় ঢেউ। বৈরী আবহাওয়ায় মাছ ধরতে না পেরে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পটুয়াখালীর আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ফিরেছেন দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার শত শত মাছ ধরার ট্রলার।
দীর্ঘ ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে নতুন আশায় সাগরে নামলেও বৈরী আবহাওয়ায় সেই আশায় বাধা পড়েছে। মাছ ধরতে না পারায় একদিকে বন্ধ আয়, অন্যদিকে বাড়ছে খাবার, বরফ, জ্বালানি ও ট্রলার পরিচালনার খরচ। ফলে সাগরে না গিয়েও ঘাটে বসে লোকসান গুনছেন জেলেরা।
বঙ্গোপসাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত জারি থাকায় আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এখন ট্রলারে ট্রলারে পরিপূর্ণ। অনেক ট্রলার কয়েক দিন সাগরে অবস্থান করেও আশানুরূপ মাছ না পেয়ে ফিরে এসেছে। আবার অনেকে আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় ঘাটে অবস্থান করছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, স্থানীয় ট্রলারের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, বাঁশখালী, ভোলা ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে আসা শত শত ট্রলার ঘাটে নোঙর করে রয়েছে। ট্রলারে অবস্থানরত জেলেদের কেউ বাজার-সদাই, পানি, বরফ ও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করছেন, কেউ আবার আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
জেলেরা জানান, দীর্ঘ ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে মাছ ধরতে নেমেছিলেন তারা। নিষেধাজ্ঞার পর প্রথম দিকে ভালো মাছ পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বৈরী আবহাওয়ায় তা পূরণ হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম। পর্যাপ্ত মাছ না পেলে জ্বালানি, বরফ, খাবার, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে ট্রলারমালিক ও জেলেদের।
বাঁশখালী থেকে আসা এফবি বাদশা ট্রলারের মাঝি খোয়েব বলেন, আমরা পাঁচ দিন আগে মাছ ধরতে সমুদ্রে গিয়েছিলাম। কিন্তু সমুদ্র উত্তাল হয়ে যাওয়ায় আলীপুর বন্দরের কাছাকাছি চলে আসি। কিছু মাছ পেয়েছি, তা নিয়েই ফিরে আসছি। কিন্তু বর্তমান বাজারে জ্বালানি তেলের যে দাম, সেই তুলনায় মাছ খুব কম পেয়েছি। এতে খরচও ওঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
মহিপুর বন্দরের জেলে সুলতান মাঝি বলেন, আমরা তিন দিন ধরে সমুদ্রে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। ট্রলার, জাল, বাজারসহ সব সরঞ্জাম প্রস্তুত। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় সাগরে যাওয়ার সাহস করছি না। মাছ ধরতে না পারলেও ট্রলারের শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ ঠিকই দিতে হচ্ছে।
কুয়াকাটার ক্ষুদ্র জেলেদেরও একই পরিস্থিতি। স্থানীয় জেলেরা জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে টানা তিন দিন ধরে তাঁরা সমুদ্রে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না। দৈনিক মাছ ধরে সংসার চালানো এসব জেলের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেক পরিবারে দেখা দিয়েছে আর্থিক সংকট।
জেলে হারুন আকন মাঝি বলেন, সমুদ্রের মধ্যে কয়েকটি ট্রলার একসঙ্গে ছিলাম। আবহাওয়া খারাপ হতে থাকায় সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিই, ঝুঁকি নিয়ে আর সাগরে থাকা যাবে না। তাই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তীরে ফিরে এসেছি।
বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর কুয়াকাটা, বিশ্বকে জানাচ্ছে উপকূলের সৌন্দর্যবিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর কুয়াকাটা, বিশ্বকে জানাচ্ছে উপকূলের সৌন্দর্য
তিনি বলেন, শুধু জেলে বা ট্রলারমালিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না। মাছ বহনকারী শ্রমিক, বরফকল, পরিবহন শ্রমিক ও আড়তদারসহ মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সবাই ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এক হাজারের বেশি ট্রলার ঘাটে এসেছে। অনেক ট্রলারই আশানুরূপ মাছ না পেয়ে ফিরে এসেছে।
৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরপরই আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় জেলেরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছেন। এভাবে বারবার মাছ ধরার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেলে জেলেদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
আলীপুরের ভাই ভাই ফিশের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে শত শত ট্রলার আলীপুর ও মহিপুরে আশ্রয় নিয়েছে। এতে মাছের আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু স্থানীয় বাজার নয়, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাছ সরবরাহেও এর প্রভাব পড়ছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মৎস্য ব্যবসায় স্বাভাবিক গতি ফেরার সম্ভাবনা কম।
পটুয়াখালী জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবা সুখী বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। সাগর উত্তাল থাকায় দমকা ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নিম্নচাপটি আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত মাছ ধরার ট্রলার ও নৌযানগুলোকে সর্বশেষ আবহাওয়া বার্তা অনুসরণ করে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হবে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ২৪ সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। ২৪ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত এবং উপকূলীয় এলাকায় দমকা হাওয়া ও ঝড়ো আবহাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ঘাটে আশ্রয় নেওয়া জেলেদের চোখ এখন আবহাওয়ার দিকে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলেই আবার জাল, বরফ ও প্রয়োজনীয় রসদ নিয়ে সাগরে ফিরতে চান তাঁরা। তবে দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পরপরই বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে আশানুরূপ মাছ না পাওয়া এবং বাড়তি খরচ সামাল দেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন জেলেরা। আগামী কয়েক দিন বৈরী আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে তাদের লোকসান আরও বাড়তে পারে।
আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় এখন আলীপুর-মহিপুরের ঘাটে দিন কাটছে শত শত ট্রলারের জেলেদের। এদিকে ঘাটে আশ্রয় নেওয়া জেলেদের চোখ এখন আবহাওয়ার দিকে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলেই আবার জাল, বরফ ও প্রয়োজনীয় রসদ নিয়ে সাগরে ফিরতে চান তাঁরা। তবে দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পরপরই বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে আশানুরূপ মাছ না পাওয়া এবং বাড়তি খরচ সামাল দেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন জেলেরা। আগামী কয়েক দিন বৈরী আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে তাদের লোকসান আরও বাড়তে পারে।
আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় এখন আলীপুর-মহিপুরের ঘাটে দিন কাটছে শত শত ট্রলারের জেলেদের।
