রেমিট্যান্স-রিজার্ভে স্বস্তি, জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতিতে বাড়ছে চাপ

প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম পৌনে তিন মাসে প্রবাসী আয় এসেছে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে বৈদেশিক খাতের এই স্বস্তির বিপরীতে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয়, দুর্বল বিনিয়োগ ও ব্যাংক খাতের চাপ এখনও রয়ে গেছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ায় উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৮ দশমিক ০২২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৭ দশমিক ০৬৪ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৩ দিনেই এসেছে ২ দশমিক ১৯৬ বিলিয়ন ডলার।

রেমিট্যান্সের এই প্রবাহের সঙ্গে বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতও। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৬ সেপ্টেম্বরের হিসাবে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময়ের তুলনায় পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই স্বস্তি এখনো অর্থনীতির সবখানে পৌঁছায়নি। কারণ, রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স বাড়লেও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ব্যবসার উৎপাদন খরচ কমছে না। রেমিট্যান্সের প্রবাহে গত অর্থবছরও শক্তিশালী ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়তে থাকে।

চলতি অর্থবছরেও সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই ও আগস্ট মিলিয়ে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৫ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বরের ২৩ দিন পর্যন্ত আরও ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার এসেছে। ফলে অর্থবছরের শুরু থেকে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি এখনো দুই অঙ্কে রয়েছে।

রেমিট্যান্স বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ছে। এতে আমদানি দায় মেটানো এবং বৈদেশিক লেনদেন সামলানোর সক্ষমতা কিছুটা শক্তিশালী হচ্ছে। মুডিসও বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস 'নেতিবাচক' থেকে 'স্থিতিশীল' করার সময় শক্তিশালী রিজার্ভ ও রেকর্ড রেমিট্যান্সকে ইতিবাচক কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এখনো বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে। জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়লে রেমিট্যান্স থেকে আসা ডলারের ওপরও চাপ তৈরি হবে।

মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও কিছুটা উন্নতির চিত্র রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছিল। অর্থাৎ মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ১৬ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।

তবে মূল্যস্ফীতি কমলেও পণ্যের দাম কমে যাওয়ার অর্থ এটি নয়। বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আগস্টে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ২৬ শতাংশের বিপরীতে মজুরি বেড়েছে কিছুটা কম হারে। এতে আয় করা মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায় চাপ থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ফলে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি এলেও সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক স্বস্তি কতটা ফিরেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

এর মধ্যে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দামও ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ টাকা করা হয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, নির্মাণ ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ে। ফলে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি আগামী মাসগুলোতে নতুন করে মূল্যচাপ তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় একসঙ্গে বাড়ে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি বাজারে পণ্য পৌঁছানোর ব্যয়ও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর একটি অংশ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে।

অর্থনীতির এই টানাপোড়েনের মধ্যে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও প্রত্যাশার তুলনায় কমছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। জুলাইয়ে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু পুনরুদ্ধারের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। এডিবির হিসাবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে আছে।