কপাল খুলছে ১ লাখ বাংলাদেশির

জাপানে শ্রমসংকট

প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

জাপানে কর্মক্ষম জনশক্তির তীব্র সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। একদিকে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে তরুণ জনশক্তিতে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে ২০৪০ সাল নাগাদ জাপানে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ কর্মীর শূন্যতা তৈরি হবে। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে জাপান সরকার ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে ১৬টি খাতে 'নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী' (এসএসডব্লিউ) এবং 'দক্ষতা উন্নয়নভিত্তিক কর্মসংস্থান' (ইএসডি) ক্যাটাগরিতে অন্তত ১২ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। জাপানের এই বিপুল চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ১ লাখ দক্ষ কর্মী পাঠানোর সুদূরপ্রসারী রোডম্যাপ নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

জাপানে বাংলাদেশি দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৪১ হাজার বাংলাদেশি অবস্থান করছেন। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা হলো— ২০২৬ সালে ২ হাজার, ২০২৭ সালে ৬ হাজার, ২০২৮ সালে ১২ হাজার, ২০২৯ সালে ৩০ হাজার এবং ২০৩০ সাল নাগাদ ৫০ হাজার কর্মী পাঠানো। জাপানের সংশোধিত শ্রমনীতি অনুযায়ী আগে বাংলাদেশের জন্য মাত্র ৬টি খাত উন্মুক্ত থাকলেও, বর্তমানে ১৬টি সুনির্দিষ্ট খাতের সবকটিতেই বাংলাদেশিরা কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

আগামী পাঁচ বছরের রোডম্যাপ অনুযায়ী, নির্মাণ (কনস্ট্রাকশন) খাতে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার, শিল্প উৎপাদনে ২০ হাজার, কেয়ারগিভার খাতে ২০ হাজার এবং অটোমোবাইল ও কৃষিতে যৌথভাবে ২০ হাজার কর্মী পাঠানো হবে। পাশাপাশি পরিবহন, রেলওয়ে এবং কাঠ শিল্পের মতো খাতগুলোও নতুন করে উন্মুক্ত হয়েছে।

জাপানে বয়স্ক মানুষের আধিক্যের কারণে 'কেয়ারগিভার' বা প্রবীণ সেবা খাতের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এ খাতে মাসিক বেতন ১ লাখ ৭৬ হাজার থেকে আড়াই লাখ ইয়েন (প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা)।

তবে এর জন্য প্রথাগত দক্ষতার বাইরে জাপানি ভাষার যোগ্যতা পরীক্ষা 'জেএলপিটি এন-৪' বা 'জেএফটি-বেসিক' এবং নির্দিষ্ট নার্সিং দক্ষতা মূল্যায়ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এই খাতে পাঁচ বছর সফলভাবে কাজের পর জাতীয় লাইসেন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে এসএসডব্লিউ-২ ভিসা পাওয়া যায়, যা পরিবারসহ স্থায়ী বসবাসের আইনি পথ সুগম করে।

বিদেশি কর্মী নিয়োগে জাপানের তিনটি মূল মাধ্যম রয়েছে— টেকনিক্যাল ইন্টার্ন (গিনো জিসশুসেই), স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার বা এসএসডব্লিউ (তোকুতেই গিনো) এবং হাইলি স্কিলড ওয়ার্কার (গিজিন কোকু)। টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ক্যাটাগরিতে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রার্থীরা ১৬০ ঘণ্টার প্রাথমিক ভাষা শিক্ষা (এন-৫ লেভেল) নিয়ে জাপানে যেতে পারেন। তিন বছর সফলভাবে কাজ করার পর কোনো অতিরিক্ত কারিগরি বা কঠিন ভাষা পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি এসএসডব্লিউ-১ ভিসায় রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সরকার 'স্টুডেন্ট মাইগ্রেশন পাইপলাইন'র ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। এর আওতায় ২০২৬ সালের মধ্যে ১০ হাজার শিক্ষার্থী পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। এইচএসসি ও এন-৫ লেভেল সম্পন্ন শিক্ষার্থীরা সেখানে সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা শেষে সহজেই নিজেদের ভিসা এসএসডব্লিউ বা ইঞ্জিনিয়ারিং ভিসায় রূপান্তর করতে পারবেন। এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ 'সেলফ-ফান্ডেড ট্রেনিং মডেল' হিসেবে কাজ করবে।

বিএমইটি-এর প্রশিক্ষণ পরিচালক মোছা. শরিফা সুলতানা বলেন, 'বাংলাদেশ থেকে এক লাখ লোক নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জাপানে যাওয়ার প্রথম ক্রাইটেরিয়াই হচ্ছে ভাষা জানা। আইএম জাপানের মাধ্যমে কর্মী বাছাই করে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর ছয় মাসের দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে ইন্টার্ন হিসেবে জাপানে পাঠানো হচ্ছে।'

দেশে জাপানি ভাষা শেখানোর উপযুক্ত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) সংখ্যা ৩৩টি থেকে ৫৩টিতে উন্নীত করা হয়েছে। খুলনা টিটিসির অধ্যক্ষ জিয়াউর রহমান জানান, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত সান্ধ্যকালীন ভাষা কোর্সে মাত্র ৪০টি আসনের বিপরীতে ৮০০ আবেদন জমা পড়েছে। বিএমইটির মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনা অভিবাসন ব্যয়ে এরই মধ্যে ১ হাজারের বেশি কর্মী জাপান গেছেন, যার মধ্যে শুধু খুলনা টিটিসি থেকেই গেছেন ১০৯ জন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম জানান, লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে 'জাপান সেল' গঠন এবং 'আমি প্রবাসী' অ্যাপের মাধ্যমে আধুনিক ডেটাবেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। টিটিসিগুলোতে বিশেষায়িত ক্র্যাশ কোর্স ও আধুনিক মেডিকেল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'জাপানি নিয়োগকর্তাদের আস্থা ধরে রাখতে টোকিওস্থ দূতাবাসের মাধ্যমে অনলাইনেই তিন থেকে সাত দিনে ডিমান্ড লেটার যাচাই করা উচিত। সরকারি অডিট, নেটিভ প্রশিক্ষক নিয়োগ এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে 'ব্র্যান্ড বাংলাদেশ' প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।'

রামরুর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মেরিনা সুলতানা সময় নষ্ট না করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, 'বিষয়টিকে তাড়াহুড়ো হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং আমরা এরইমধ্যে অনেক সময় নষ্ট করেছি। যেখানে আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ তরুণ, সেখানে জাপানের মতো মার্কেটগুলোকে শক্তভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। টিটিসিগুলোকে শুধু কর্মী পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, কর্মীরা যাতে সেখানে মানিয়ে নিতে পারেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ডেডিকেশন থাকতে হবে।'

বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা ও বিমানের টিকিট প্রাপ্তিতে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় বাধা। তথ্যের অভাবে দালাল চক্রের প্রতারণা এবং টিটিসিগুলোর পুরোনো যন্ত্রপাতির কারণে আধুনিক রোবোটিক আর্ম বা সিএনসি মেশিন চালানোর দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে। এ কারণেই নেপাল যেখানে ২০২৪-২৫ সালেই ৬০ হাজার কর্মী পাঠিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ ভাষাগত ও কর্মসংস্কৃতির ঘাটতিতে কিছুটা পিছিয়ে।

উত্তরণের জন্য সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ৯৫টিতে উন্নীত করেছে এবং তাদের ১৫ লাখ টাকার জামানতের শর্ত শিথিল করেছে। প্রার্থীরা যাতে অর্থের অভাবে বঞ্চিত না হন, সেজন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে বিনা জামানতে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পাশাপাশি, বেসরকারি উদ্যোগে সাভারে কাওয়াই গ্রুপের আবাসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে জাপানি নেটিভ শিক্ষকদের মাধ্যমে নিবিড় ভাষা ও কর্মসংস্কৃতির যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, তা দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্যও একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত।